আপনার ঘরের দোরগোড়ায় যখন হাজির অ্যালঝাইমার্স নামক অসুখটি

পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হিতেন একজন সুশিক্ষিত এবং পরিশ্রমী মানুষ। তাঁর ভবিষ্যৎটিও ছিল খুব উজ্জ্বল। কলকাতায় হিতেন তাঁর বন্ধুমহলে অত্যন্ত সম্মাননীয় ছিলেন। কারণ তাঁর নির্ভীক স্বভাব, কখনও মরে যাওয়ার কথা না বলা, যে কোনওরকম পেশাদারি প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার জন্য অদম্য মনোবল তাঁকে তাঁর বন্ধু ও পরিচিতমহলে একটা বিশিষ্ট জায়গা করে নিতে সাহায্য করেছিল। হিতেনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সুনন্দার এবং তাঁদের খুব মিষ্টি ও বুদ্ধিদীপ্ত দু'টি মেয়েও ছিল।

সুনন্দার বোন তনুজা এবং ভাই সুপ্রিয় দু'জনেই ছিলেন পেশাদারি ব্যক্তিত্ব; কলকাতায় ও ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁদের পরিবার-পরিজনরা থাকতেন। সুনন্দার মা মধুরিমা দাস ও বাবা রঘুবর দাস তাঁদের মেয়ের সঙ্গে একই শহরে দশ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বসবাস করতেন।

প্রায় একবছর আগে এক শুক্রবার বেলা দশটার পরে সুনন্দা এবং তনুজা দু'জনকেই তাদের মা ফোন করে অদ্ভুত একটা খবর দিয়েছিলেন। খবরটা হল তাদের বাবা রঘুবর সেদিন সকালে বাড়ি থেকে বেরোন এবং মা যখন মেয়েদের ফোন করছেন তখনও পর্যন্ত তাদের বাবা বাড়িতে ফেরেননি। সেই সঙ্গে মা জানান যে বাবার ফোনটাও বন্ধ রয়েছে। সেকথা শুনে সুনন্দা এবং তনুজা তাড়াতাড়ি তাদের  মায়ের কাছে চলে আসে। রাস্তায় বেরিয়ে তন্নতন্ন করে বাবাকে খোঁজে এবং চেষ্টা করে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেয় যে বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে। তাদের মা মধুরিমা দাসকে কোনও সান্ত্বনাই  দেওয়া যাচ্ছিল না। তিনি বারবার বলছিলেন যে তাঁর স্বামী রঘুবর ইদানীং কীভাবে খুব অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন, কখনও বা অযৌক্তিক আচরণ করতেন। অসময়ে ঘুমিয়ে পড়তেন এবং ঘুমের মধ্যে হেঁটে চলেও বেড়াতেন।

হিতেন পুলিশের কাছে নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ তাঁকে জানায় যে ২৪ ঘণ্টা কাটা না পর্যন্ত তারা কোনও ব্যবস্থা নিতে পারবে না। অন্যদিকে বাড়ির লোকেরা ততক্ষণে শহরের রাস্তায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনও ফল পায়নি। তাই তারাও অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

সৌভাগ্যবশত, রাত দুটোর সময়ে রঘুবর বাড়িতে ফেরেন। যখন তাঁর পরিবারের লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন তখন তিনি  জানান যে তিন কিলোমিটার দূরে যে মেলা হচ্ছে তিনি সেখানেই ছিলেন। রাত ১১টা পর্যন্ত সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলতেই তিনি ব্যস্ত ছিলেন। এই ঘটনাটা তাঁর ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটা বিষয়। তাঁর পরিবারের লোকেরা সারাদিনের ঘটনায় খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু রঘুবর বাড়ি ফেরার পরে তাঁরা স্বস্তি পান এবং যে যাঁর নিজের জায়গায় ফিরে যান।

অবসর নেওয়ার আগে রঘুবর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। তিনি  একজন খেলোয়াড়ও ছিলেন। সবাই তাঁকে একজন শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ বলে জানত। তিনি তাঁর জীবনের অত্যন্ত ছোট ছোট কাজগুলির ক্ষেত্রেও ছিলেন অত্যন্ত যত্নবান। এখন তাঁর সমস্ত আচরণই আলাদা হয়ে গিয়েছে। আর তা দেখে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠেছে।

সুনন্দা তাঁর বাবাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করেছিল। তবে এরপরে যে রোগটি নির্ণয় করা হল তা সবার কাছেই ছিল একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরে জানা গেল রঘুবর অ্যালঝাইমার্স রোগে আক্রান্ত। ডাক্তার বলেছিলেন রঘুবর এখন থেকে বেশ কয়েক বছর অসুস্থ থাকবেন। এই খবরটা কেউই আশা করেনি। এখনও পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকরা, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী রঘুবরের কাজকর্মের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করে অবাক হয়ে যান। কিন্তু তাঁর পরিবারের লোকেরা কখনোই ভাবতে পারেননি যে রঘুবরের মধ্যে  নিউরোডিজেনারেটিভ সংক্রান্ত অসুস্থতা দেখা দেবে।

বছরখানেক ধরে রোগ নির্ণয়ের সময়ে রঘুবরের প্রয়োজন ছিল তাঁর প্রতি লাগাতার মনোযোগের; স্বাভাবিকের তুলনায় তাঁর খিদে কমে গিয়েছিল, খাবারদাবারের প্রতি কোনও আগ্রহই তাঁর ছিল না এবং যে কাজগুলো তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সামলাতেন দেখা গেল যে সেগুলো আর সুশৃঙ্খলভাবে তিনি সামলাতে পারছেন না।

মধুরিমা তাঁর স্বামীর অসুস্থতার জন্য খানিকটা বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং অসুখের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রেও তাঁর অনেক অসুবিধা হয়েছিল। যখন তিনি চাইছিলেন তাঁর স্বামী রঘুবরের জন্য সবকিছু করতে তখন তিনি দেখলেন তাঁর পক্ষে সহানুভূতিশীল এবং ধৈর্যশীল থাকা সম্ভবপর হচ্ছে না। তবে পরিবারের সদস্যরা তাদের নিজের মতো করে মধুরিমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করে।

রঘুবরের অসুস্থতাকে তাঁর পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিচার-বিবেচনা করেছিলেন। এর মধ্যে তাঁর মেয়ে ও হিতেনও যুক্ত ছিল। হিতেন  চেষ্টা করতেন একইসঙ্গে তাঁর শ্বশুরমশাই এবং নিজের মেয়েদের পড়াশোনার প্রতি  যত্নবান হতে। আমাদের দেখা হলে এই বিষয়ে হিতেন বিশেষ কিছু বলতেও চাইতেন না; কিন্তু আমি বুঝতাম যে তিনি মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কাঠিন্য সম্পর্কেও তিনি সচেতন ছিলেন এবং তা যে খুব তাড়াতাড়ি প্রসারিত হতে পারে সেই বিষয়েও হিতেন ওয়াকিবহাল ছিলেন।

রঘুবরের অসুস্থতা এখনও রয়েছে এবং সেজন্য তিনি বাড়িতে যত্নআত্তির মধ্যেই রয়েছেন। পরিবারের লোকেরা জানেন যে পরিস্থিতি যদি খারাপ হয় তাহলে তাঁর জন্য বার্ধক্যজনিত সেবা-সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই  ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। অ্যালঝাইমার্স অসুখটি রুগির পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের ক্ষেত্রে মোকাবিলা করা যে খুবই কষ্টসাধ্য বিষয়, তা রঘুবরের প্রিয়জনের করা সেবা ও যত্ন দেখলেই বোঝা যায়।

এই ব্যক্তিগত প্রবন্ধটিতে লেখকের অনুরোধের জন্য তাঁর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।       

     

Was this helpful for you?