পরীক্ষার মরশুমে আত্মহত্যার লক্ষণগুলির চিহ্নিত করবেন কি ভাবে?

পরীক্ষার সময়ে স্কুল পড়ুয়া এবং বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েরা খিটখিটে, বদমেজাজি এবং মারাত্মক মানসিক চাপের শিকার হয়। তবে এই পরিস্থিতির হাত থেকে তারা নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম— এই কথা শুনে আদৌ অবাক হওয়ার কিছুই নেই।

পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে, পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে এবং পরীক্ষার ফল বেরনোর আগের সময়টুকু একজন ছাত্র বা ছাত্রীর পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে তাদের উপর নানারকম চাপ থাকে। পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রত্যাশা যেমন তাদের নিজেদের থাকে, তেমন পরীক্ষার্থীর বাবা-মা এবং শিক্ষকরাও তাদের কাছ থেকে ভালো ফলাফলের আশা করেন। এত সব প্রত্যাশার চাপের মোকাবিলা করতে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা কার্যত হিমশিম খেয়ে যায়।

এই সময়ে অভিভাবক, শিক্ষক বা বন্ধুদের উচিত একজন পরীক্ষার্থীর জীবন, যা অত্যন্ত মূল্যবান, তা রক্ষার ক্ষেত্রে দ্বাররক্ষী হিসেবে ভূমিকা পালন করা।

 ছোটরা তাদের মনের অনুভূতিগুলিকে সব সময়ে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু বড়দের ক্ষেত্রে এমন সমস্যা খুব একটা দেখা যায় না। তাই ছোটদের সমস্যা সমাধানের জন্য বড়দের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। ছোটদের মানসিক বিপর্যয়গুলি তাদের আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে আসে।

শিশু বা বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যখন আত্মহত্যার প্রবণতা বা চিন্তা জেগে ওঠে, তখন তাদের আচরণে অস্বাভাবিক কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সেগুলি হল—

  • সব সময়ে নিজের মৃত্যু কামনা করা বা মরে যেতে চাওয়া

  • তাদের মধ্যে একপ্রকার অদ্ভুত নীরবতা আসে। তারা নিজেদের অধিকাংশ সময়ে ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখে।

  • খিদে বোধের পরিবর্তন দেখা যায়। হয় তারা বেশি খায়, না হয় কম খায়। ভাজাভুজি জাতীয় মশলাদার খাবার, নুন চড়া খাবার বা উত্তেজক পানীয়র প্রতি তাদের আকর্ষণ জন্মায়।

  • মেজাজ-মর্জিগতভাবে তারা অত্যন্ত খামখেয়ালি হয়ে পড়ে। তুচ্ছ কারণে কখনও খুব রেগে যায় আবার অল্পতেই ভেঙে পড়ে।

  • বাবা-মা বা ভাই-বোনদের উপর যখন-তখন রেগে গিয়ে মেজাজ দেখায়।

  • কারও কারও আচরণে অস্বাভাবিকভাবে মানসিক উদ্বেগ দেখা যায়।

  • যে কাজে আগে তারা উৎসাহ বোধ করত, ক্রমশ সেই কাজেই তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে।

  • আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনও ইচ্ছেই তাদের মধ্যে জেগে ওঠে না।

  • নিজেদের পছন্দের বিষয়গুলিকে তারা দূরে সরিয়ে রাখে।

  • হঠাৎ করেই তারা মদ, সিগারেট বা অনলাইন শপিং-এর উপর নির্ভরশীল
    হয়ে পড়ে।

যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অত্যন্ত বেশি পরিমাণে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়, তাদের কথাবার্তার মধ্যেও এর লক্ষণ ফুটে ওঠে। যেমন— ''যদি আমি মরে যেতাম, তাহলে আর আমাকে পরীক্ষা দিতে হত না'' বা ''আমার জন্যই বাবা-মা এত চিন্তিত'' প্রভৃতি নেতিবাচক মনোভাব দেখা যায়।

পরীক্ষার সময়ে কারা মানসিকভাবে অসহায় বোধ করে?

যে কোনও ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যেই, তারা লেখাপড়ায় যেমনই হোক না কেন, তাদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রবণতা দেখা দেয়। এই ক্ষেত্রে যে সমস্ত শিক্ষার্থী সম্প্রতি কোনও আতঙ্কগ্রস্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে বা যাদের উপর প্রত্যাশার চাপ খুব বেশি থাকে, তাদের মধ্যে আত্মহত্যা করার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে।

কীভাবে এই সমস্যার প্রতিকার সম্ভব?

যদি দেখা যায় যে, উপরে আলোচিত লক্ষণগুলির মধ্যে যে কোনও একটি বিষয় একজন পরীক্ষার্থীর আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে যে, ওই পরীক্ষার্থীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

ছাত্র-ছাত্রীদের হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা জরুরি। উপরে যে সব লক্ষণগুলির কথা আলোচনা করা হল, সেগুলি যদি কোনও পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রকাশ পায়, তাহলে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা রয়েছে কিনা, তা ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞাসা করা দরকার। যদি এক্ষেত্রে উত্তর হ্যাঁ হয়,  তাহলে তার কাছ থেকে জানতে হবে যে, কীভাবে তার মনে আত্মহত্যার চিন্তা আসছে। তাদেরকে এ-ও জিজ্ঞাসা করতে হবে যে, কোন পদ্ধতিতে তারা আত্মহত্যা করতে চাইছে এবং যখন তাদের মাথায় এই চিন্তা আসছে, তখন তাদের মানসিক অবস্থা ঠিক কীরকম হচ্ছে। এইভাবে প্রশ্ন-উত্তরের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থীর বিপদের সম্ভাবনার মাত্রাটি বুঝতে পারা সম্ভব হবে এবং তার প্রতিকারের জন্য কী ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে, সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে।

আমাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা রয়েছে যে, আত্মহত্যার প্রসঙ্গে কারও সঙ্গে কথা  বললে, তাকে আরও বেশি করে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মত হল— যার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, তার সঙ্গে সেই বিষয়ে কথা বললে অপকারের চাইতে উপকারই বেশি হয়। একদিকে যেমন আত্মহত্যা করতে যাওয়া মানুষটির মূল সমস্যা বোঝা যায়, তেমন অন্যকে নিজের সমস্যার কথা জানানোর মাধ্যমে আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি মানসিকভাবে কিছুটা শান্তি পায়।

দ্বাররক্ষী হিসেবে যারা কাজ করে, তাদের এই সমস্যার সমাধানে এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে। তাদের উচিত নিজের মতামত চাপানোর আগে বিপন্ন পরীক্ষার্থীর সমস্যা মন দিয়ে শোনা। যদি এক্ষেত্রে বাবা-মা, শিক্ষক বা বন্ধুরা দ্বাররক্ষীর ভূমিকা পালন করে, তাহলে তাদের লক্ষ্য হবে পরীক্ষার্থীকে আত্মহত্যা করা থেকে বিরত করা, তাকে বোঝাতে হবে যে, আত্মহত্যা করা মহা পাপ।

যদি দেখা যায় যে, কোনও পরীক্ষার্থীর মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি কম রয়েছে, তাহলে তার আচরণ ভালোভাবে নজরে রাখতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে যে, তার প্রতি সাহায্যকারী ব্যক্তির সম্পূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে সেই সহানুভূতির প্রকাশ ঘটবে।

যদি কোনও পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাঝারি থেকে অত্যন্ত বেশি পরিমাণে আত্মহত্যার ঝুঁকি থাকে, তাহলে তাকে আত্মহত্যার মতো বিপজ্জনক ঘটনার পরিণতির কথা বুঝিয়ে সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করতে হবে এবং জীবনের বাধাগুলিকে অতিক্রম করার জন্য তাদের সাহস জোগাতে হবে। যদি দেখা যায় যে, আত্মহত্যা করার জন্য কেউ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে, তখন তাকে বলা জরুরি যে, তার সমস্যা সমাধানের জন্য সাহায্যকারী ব্যক্তি সব সময়ে তার পাশে থাকবে। এই কৌশল নেওয়ার মাধ্যমে একজন আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষ তার মনের বিপর্যয়গুলি সাহায্যকারী ব্যক্তিকে শুধু বিশ্বাস করে বলতেই পারবে না, তার মনের অন্যান্য উদ্বেগগুলির কথাও খোলাখুলি জানাতে সক্ষম হবে।

এইভাবে সাহায্যকারী ব্যক্তি একজন পরীক্ষার্থীর মনের বিপন্নতার কথা তার বাবা-মাকে যথা সময়ে জানিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিতে পারে। এই বিশেষজ্ঞ স্কুলের কাউন্সেলর, সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্ট— যে কেউ হতে পারেন। যদি একজন অভিভাবক তার সন্তানের সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে সে নিশ্চয়ই সাধারণ ডাক্তারের কাছে না গিয়ে এই সমস্যার সমাধানের জন্য একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবে। আর অন্যদিকে একজন জেনারেল ফিজিশিয়ানের কাছে যদি কেউ এই সমস্যা নিয়ে যায়, তাহলে তাঁর উচিত অবিলম্বে সেই রুগিকে একজন মনোবিদের কাছে পাঠানো। একটা কথা কখনোই ভুলে গেলে চলবে না যে, সাহায্যকারী ব্যক্তির আন্তরিক প্রচেষ্টা একজন অসহায়, বিপন্ন পড়ুয়ার জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।   

Was this helpful for you?

প্রস্তাবিত