We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

মানসিক চাপ যখন জীবনের অঙ্গ হয়ে যায়

মানসিক চাপ- এই শব্দটির সঙ্গে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু মানসিক চাপ বলতে কী বোঝায়? আমাদের শরীরে ও মনে এই চাপ কীভাবে প্রভাব ফেলে? এই প্রবন্ধে এসব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে।  

যখন আমরা চাপের শিকার হই তখন আমাদের শরীরে তার কী প্রভাব পড়ে?

পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে আমাদের শরীরের গ্রহণ ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে ওঠে। যেমন- খুব গরমের দিনে আমাদের ঘাম হয়। এই প্রক্রিয়া আমাদের শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। ঠান্ডার দিনে আমাদের শরীরে কাঁপুনি হয়, যা থেকে বেরনো তাপ আমাদের শরীরকে গরম করে। একইভাবে যখন আমরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকি তখন তার মোকাবিলা করার জন্য আমাদের দেহের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য, যা হোমিওস্ট্যাটিস নামে পরিচিত, তার পুনরুত্থান হয়। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা মানসিক চাপের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে পারি এবং দ্রুততার সঙ্গে সেই চাপ কাটিয়েও উঠতে পারি।

আপনারা কি কখনও লক্ষ্য করেছেন যখন আমরা ভয়ঙ্কর কোনও জন্তু-জানোয়ার দেখতে পাই বা আমাদের জীবনে ঘটতে চলা কোনও উত্তেজনাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে, যেমন- পরীক্ষার ফলাফল বেরনোর সময়ে কীভাবে আমাদের হৃদপিণ্ডের গতিবেগ বেড়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর হয়ে যায়? এর কারণ হল তখন  আমাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন যেমন- কর্টিজল ও অ্যাড্রেনালিন উৎপন্ন হয়। এই স্ট্রেস হরমোনের প্রভাবে আমাদের মধ্যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে দূরে পালাতে বা লড়াই করতে অথবা নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। যখন আমাদের মন থেকে চাপ উধাও হয়ে যায় তখন শরীরে স্ট্রেস হরমোনের প্রভাব কমতে থাকে ও শরীরের কার্যকলাপ আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে। আমাদের মস্তিষ্কও এই একইভাবে কাজ করে এবং জীবনে সৃষ্টি হওয়া মানসিক চাপের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়েও নিতে পারে। একে নিউরোপ্লাসটিসিটি বলা হয়। মস্তিষ্কের এই নিউরোপ্লাসটিসিটি নামক দক্ষতার জেরে মানুষের মধ্যে নিউরাল পাথওয়ে বা এমন এক রাস্তা গড়ে ওঠে, যা শেখার ও প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা বা মানসিক  চাপ ও আঘাত সহ্য করার শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি নিউরাল পাথওয়ে কতগুলো নিউরনের সমষ্টি, যা আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকে। মস্তিষ্কে এহেন রাস্তা গড়ে ওঠার ফলে সে তার কার্যকলাপ সঠিকভাবে করতে পারে।  নিউরাল পাথওয়ের গঠনকে যেমন নিউরোপ্লাসটিসিটি বলা হয় তেমন নিউরনের  গঠনকে নিউরোজেনেসিস বলে অভিহিত করা হয়।  

চাপ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক

অল্প পরিমাণ মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের মধ্যে থাকে। কিন্তু একটানা চলতে থাকা মানসিক চাপ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একনাগাড়ে চলা মানসিক চাপের প্রভাব আমাদের স্বাভাবিক পরিপাকক্রিয়ার উপর পড়ে। কানাডার দু'জন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট হান্স সিলি এবং অস্ট্রিয়ান, যাঁরা মানসিক চাপ সংক্রান্ত গবেষণার পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হন, তাঁদের মতে যে কোনও অসুখের পিছনে একটা বড় কারণ হল মানসিক চাপ। কারণ লাগাতার চাপের ফলে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রাসায়নিক পরিবর্তন দেখা যায়।

সাময়িক চাপ মোকাবিলার জন্য আমাদের শরীরে একটা স্বাভাবিক দক্ষতা থাকে। স্ট্রেস হরমোন আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশের কার্যকলাপের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এই হরমোনের প্রভাবে হৃদ্‌পিণ্ডের গতিবেগ বেড়ে যায়। অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণের ফলে হৃদ্‌পিণ্ড থেকে বেশি রক্ত প্রবাহিত হয় এবং আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে ও ঘন ঘন তা হতে থাকে। যদি কোনও মানুষের মধ্যে এক মাসের উপর বা এক বছরের বেশি সময় ধরে মানসিক চাপ থাকে তাহলে শরীরের সর্বাঙ্গীন কার্যকলাপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সঙ্গে চাপ সহ্য করার মতো শক্তি মানুষের শরীর থেকে হারিয়ে যায়। একজন মানুষ, যে বৈবাহিক জীবনে সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে বা একজন ব্যক্তি লাগাতার কাজের চাপে নাজেহাল সেই মানুষটার মধ্যে একটানা মানসিক চাপ লক্ষ্য করা যায়। যখন মানসিক চাপ আমাদের জীবনযাপনের অঙ্গ হয়ে যায় তখন সেই চাপের বৃত্ত একটানা না ঘুরে মাঝে মাঝে মন থেকে সরে যায়, এই পরিস্থিতিতে অনবরত হৃদ্‌পিণ্ড দিয়ে প্রবাহিত রক্তের গতিবেগের মাত্রা বেড়ে যায় এবং মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর হয়ে যায়।

ঠিক একইরকমভাবে আমাদের মস্তিষ্কও তার কার্যক্ষমতা বলে মানসিক চাপ সহ্য করে। কিন্তু সেই চাপ যদি বহুদিন ধরে একটানা চলে তাহলে সেই অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার শক্তি আর মস্তিষ্কের থাকে না। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাসটিসিটি নামক ক্ষমতাও হ্রাস পায়। এর ফলে মস্তিষ্কের কার্যাবলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাপ সহ্য করার জন্য মস্তিষ্কে নতুন নিউরাল পাথওয়ে বা রাস্তা গড়ে ওঠে। কিন্তু সীমাহীন চাপ মস্তিষ্কে নিতুন নিউরাল পাথওয়ে গঠনের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিঘ্নিত হয়।

নিউরোফিজিওলজিস্টরা লক্ষ করেছেন যে মানুষের শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে কর্টিজল হরমোন থাকলে তা মানুষের শরীরে অবস্থিত আর্টারি বা ধমনীর ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে কার্ডিওভাস্কুলার সমস্যা, স্ট্রোক বা রক্তে গ্লুকোজের বাড়বাড়ন্ত হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে যতটুকু চাপ মস্তিষ্কের সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে তার থেকে যদি একটানা বেশি চাপ সহ্য করতে হয় তাহলে মনোরোগ সংক্রান্ত সমস্যা, যেমন- অবসাদ, উদ্বেগ, সোমাটোফর্ম সমস্যা নামক প্রভৃতি রোগ দেখা দেয়। এই পরিস্থিতির আরও  অবনতি হয় যদি কেউ মদ্যপান বা অন্যান্য নেশার বশবর্তী হয়ে ওঠে।

চাপমুক্ত হওয়ার উপায়-

এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মানসিক চাপ সহ্য করার দক্ষতা একেকজনের ক্ষেত্রে  এক-একরকম হতে পারে। গড়ে একজন মানুষ কত পরিমাণ চাপ কীভাবে সহ্য করছে তা পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। যদি দেখা যায় যে কোনও মানুষ অধিকাংশ সময়েই চাপের মধ্যে রয়েছে বা চাপ সেই মানুষটার জীবনের অঙ্গে পরিণত হয়েছে তাহলে নিম্নলিখিত উপায়ে অবিলম্বে মানসিক চাপ দূর করা জরুরি:

  • শরীরচর্চা- নিয়মিত শরীরচর্চা স্ট্রেস হরমোনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শক্তি জোগায় এবং শারীরিক কাজর্মের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষার কাজে সাহায্য করে। এই শরীরচর্চার মধ্যে হাঁটাহাঁটি, দৌড়দৌড়ি, জগিং বা
    নাচ পড়ে।
  • যোগচর্চা এবং ধ্যান বা মেডিটেশন- এর মধ্য দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যাবলীগত দক্ষতার উন্নতি হয় যা নিউরোপ্লাসটিসিটি বাড়াতে
    সহায়তা করে।
  • শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত শরীরচর্চা এবং স্বস্তি পাওয়ার কৌশল অনুশীলন- এর মাধ্যমে মানুষের রক্ত চলাচলের ক্ষমতা বাড়ে, হৃদ্‌পিণ্ডের গতিবেগ ও রক্তচাপ নিম্নমুখী হয়।

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য নিমহ্যান্সের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার শিবরাম ভারামবল্লি-র সাহায্য নেওয়া হয়েছে।