মহিলা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যার প্রবণতা নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার

মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার পিছনে থাকে নানাবিধ কারণ। এই সাক্ষাৎকারে মহিলা, তাদের মানসিক অবসাদ এবং সামাজিক উপাদান, যা মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যার প্রবণতা বাড়ায়, নিয়ে হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সংস্থার চেয়ারম্যান সুব্রত বাগচিকথা বলেছিলেন ডঃ প্রভা এস চন্দ্রা-র সঙ্গে। সেই কথপোকথন সংক্রান্ত ভিডিওটির সম্পাদিত অংশের লিখিত রূপ তুলে ধরা হল-
 

সুব্রত বাগচি: আ নিউ ডাইমেনশনে আপনাদের স্বাগত জানাই। আমি সুব্রত বাগচি এবং আমার সঙ্গে আজ এই স্টুডিওয় উপস্থিত রয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ্‌ অ্যান্ড নিউরোসাইন্সেস-এর সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রধান ও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর উইমেন্স মেন্টাল হেলথ্‌-এর সেক্রেটারি ডঃ প্রভা চন্দ্রা।
ডঃ চন্দ্রা আপনাকে এই অনুষ্ঠানে স্বাগত। আ নিউ ডাইমেনশন-এ আমার অতিথি হয়ে আসার জন্য আপনাকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।

ডঃ প্রভা চন্দ্রা: এই অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমিও খুব আনন্দিত।

সুব্রত বাগচি: এটা আমাদের কাছে খুবই সৌভাগ্যের বিষয় যে আপনি আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে মহিলা ও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন। কিন্তু তার আগে আমরা আপনার কাছে জানতে চাইব যে আপনার আজকের দিনটা কেমন ছিল?

প্রভা চন্দ্রা: আজকের দিনটা খুবই ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে আমার। আজকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে আমার রুগি দেখার দিন ছিল আর আজ আমি এমন চারজন মহিলাকে দেখলাম যাঁদের সমস্যার মধ্যে কোনও মিল নেই। এদের মধ্যে একজন অল্পবয়সি মেয়ে ছিল যে বৌদ্ধিক অক্ষমতায় ভুগছে। ওদিকে তার পরিবার তার বিয়ে দেওয়ার জন্য চিন্তাভাবনা করছে; আরেকজন মহিলা ছিলেন যিনি সফট্‌ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তিনি যৌন সমস্যা ও নানারকম শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এবং যার মূলে রয়েছে সম্ভবত তাঁর মানসিক অবস্থান; অন্যদিকে, আরেকজন মহিলা যিনি মা হতে চাইছেন কিন্তু অতীতের মানসিক অবসাদ তাঁর পিছু ছাড়ছে না। তাই তিনি তাঁর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন এই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। ব্যস, এভাবেই ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে আজ আমার দিন কেটেছে।

সুব্রত বাগচি: চার নম্বর মহিলার কী সমস্যা হয়েছে?

প্রভা চন্দ্রা: উনি আসলে খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যায় ভুগছেন।

সুব্রত বাগচি: বুঝেছি, আচ্ছা এই মহিলাদের বয়স কত ছিল?

প্রভা চন্দ্রা: প্রত্যেকেরই বয়স ৩৫-এর নীচে। সেদিক থেকে দেখলে সবাই অল্পবয়সি।

সুব্রত বাগচি: এই সমস্যাগুলো কি শহরেই বেশি দেখা যায় নাকি গ্রামেও এই ঘটনা ঘটে, কী মনে হয় আপনার?

প্রভা চন্দ্রা: না না একেবারেই নয়। যেমন- বৌদ্ধিক অক্ষমতায় যে মহিলা ভুগছেন তিনি দাভাঙ্গেরের গ্রামীণ অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। আরেকজন এসেছিলেন নেল্লোর থেকে। তাই এই সমস্যা শুধু শহরেই হয় তেমন কথা কখনোই নিশ্চিত করে বলা যায় না। এসব সমস্যা ভারতের প্রতিটি কোণে দেখা দিতে পারে।

সুব্রত বাগচি: তাহলে এই সমস্যার সঙ্গে শহর-গ্রামের কোনও সম্পর্ক নেই। বা এই সমস্যার সঙ্গে গরিব বা বড়লোকেরও কোনও যোগ নেই। (প্রভা চন্দ্রা: না, কোনওভাবেই যোগ নেই।) এই বিষয়ে আমি আপনার মতামত জানতে চাই। আমাদের দেশের জনসংখ্যা ১.২ কোটি এবং আমরা প্রায়শই বলি যে আমাদের দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা চার হাজারেরও কম ও সম্ভবত দশ হাজারের মতো প্রশিক্ষিত চিকিৎসক রয়েছে। এটা সত্যি বিশাল সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার মতো একটা বিষয়। আবার ১.২ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৫০ শতাংশ মহিলা। কিন্তু তার মানে আমি এটা বলছি না যে ৫০শতাংশ মহিলার মধ্যেই ৫০ শতাংশ সমস্যা রয়েছে। কিছু মানুষ মনে করে যে মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টা সম্ভবত একটা বিরাট সমস্যা। শুধু যে এর ফলে একজন মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়। অনেকসময়ে নীরবে সেই মানুষের পরিচর্যাকারীরাও দুর্দশার মধ্যে পড়ে। এবং একটা পরিবারের কাছে এই পরিস্থিতি মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এমনকী এর শাখা-প্রশাখা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তাই আপনি আমাদের বলুন যে মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন- এই বিষয়টার প্রতি কি সত্যিই আমাদের বিশেষভাবে নজর দেওয়া উচিত?

প্রভা চন্দ্র: আমার মতে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন এবং আমিও এই বিষয়টা প্রায়শই খতিয়ে দেখার কথা ভাবি। আমার মনেও প্রশ্ন জাগে যে কেন পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টা বেশি গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়? এমনকী, গোটা সমাজও মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টার উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করে। এই বিষয়ে বহু বইপত্রও রয়েছে। যেমন- মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার জন্য ভারতীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সমাজের বিশেষ বিভাগ রয়েছে। কিন্তু পুরুষদের বেলায় এমন বিভাগ নেই। তাই একথা জোরের সঙ্গে বলাই যায় যে আমাদের সমাজে এটা সত্যিই একটা সমস্যা।

মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ক্ষেত্রে নানাভাবে এই লিঙ্গ-বৈষম্য প্রকাশ পায়। যেমন আমি নিশ্চিত যে পুরুষদের যদি এই সমস্যা থাকে তাহলে তা একান্তই তাদের অনন্য সমস্যা বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় কারণ পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে বেশি পরিমাণে মানসিক অবসাদ দেখা দেয়, যাকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার একটা প্রচলিত মাপকাঠি বা অবস্থা হিসেবে ধরা হয়।

সুব্রত বাগচি: তাহলে আপনি বলছেন যে এই বিষয়ে মহিলাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত বেশি এবং এজন্য দায়ী জৈবিক উপাদান বা জৈবিক ও সামাজিক
দুটো ক্ষেত্রই?

প্রভা চন্দ্রা: একদম ঠিক। সেই সঙ্গে আমি প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়টাকে একটা ত্রিভুজের আকার হিসেবে ভাবার চেষ্টা করি। প্রথমে থাকে সামাজিক উপাদান, তারপরে থাকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র এবং তৃতীয় ধাপে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। তাই মানসিক গঠনের দিক থেকে পুরুষদের চাইতে মহিলারা ভিন্ন হয়। এবং এর জন্য শুধু যে মহিলাদের জৈবিক বৈশিষ্ট্যই দায়ী থাকে, তা নয়। লিঙ্গবৈষম্য সম্পর্কে আমাদের সামাজিক ধ্যানধারণাও এক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু যে ভাবে মহিলারা তাদের জীবনে ঘটা সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে মোকাবিলা করেন, যেমন- যে ভাবে এই বিষয়ে কথা বলেন; যে ভাবে সমস্যাগুলো নিজেরদের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন, এইগুলো মহিলাদের ক্ষেত্রে একেবারেই তাঁদের নিজস্ব পন্থা। আমার মতে এটা একপ্রকার ত্রিভুজের মতো, যার মাঝখানে রয়েছে মহিলারা এবং এইসব মিলিয়েই তার শক্তি এবং প্রবণতাগুলো গড়ে উঠে।  

সুব্রত বাগচি: আমরা মুখে মহিলা শব্দটা ব্যবহার করি ঠিকই, কিন্তু আমরা প্রকৃতপক্ষে তাদের গোটা জীবনচক্র নিয়েই কথাবার্তা বলি, যেমন- যে সময় তারা এই পৃথিবীতে মেয়ে হয়ে জন্মায়, তাদের কৈশোর-পূর্ব সময়, বয়ঃসন্ধি, যুবতী, মাঝবয়সি এবং অবশ্যই তার বার্ধক্য। তাই যখন সে মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে উঠছে তখন তার স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার সম্ভাব্যতা কি পুরুষদের থেকে আলাদা?

প্রভা চন্দ্রা: ঠিক তাই। আমার মনে হয় এটা একটা কারণ, যার ফলে মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টা এতটা অনন্য হয়ে দাঁড়ায়। তাদের জীবদ্দশার বিভিন্ন পর্যায়, সেখানে তাদের জনন ক্ষমতা অর্থাৎ সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর্বও কোনও না কোনওভাবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের গতিপথ নির্ধারণ করে। এমনকী, তাদের দৈহিক গঠন বা স্বাস্থ্যও তাদের জীবন-পর্যায় দ্বারা নির্ধারিত হয়। যেমন- অল্পবয়সি মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকে একটা তাৎপর্যপূর্ণ সময়কাল হিসেবে ধরা হয়। বয়ঃসন্ধির আগে পর্যন্ত একজন ছেলে ও মেয়ের মধ্যে অধিকাংশ অব্যবস্থার (ডিসঅর্ডার) বা সমস্যার লক্ষণগুলোর চিহ্ন একরকম থাকে। বিশেষ করে অবসাদ বা উদ্বেগের মতো সমস্যা। তারপর হঠাৎই বয়ঃসন্ধির সময়ে একটা বড়সড় রদবদল চোখে পড়ে। সহসাই একজন মেয়ের মধ্যে একটা ছেলের চেয়ে অবসাদ বাড়ার সম্ভাবনা চারগুণ বেশি হয়ে দেখা দেয়।

সুব্রত বাগচি: এবার একটু নারীত্বের বিষয়টাকে নিয়ে কথা বলা যাক যা শুরু হয় একজন শিশুকন্যার জন্মক্ষণ থেকে। তারপর আস্তে আস্তে তার বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো, এরপর তার মধ্যে জন্মায় সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা এবং এভাবেই তার জীবনচক্র ক্রমশ বিকাশ লাভ করতে থাকে। আপনি কি লক্ষ্য করেন যে একটি মেয়ের জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের উপর নির্ভর করে তার জীবনে আলাদা-আলাদা রকমের চ্যালেঞ্জ এবং সমস্যা গড়ে ওঠে, বিশেষ করে তার মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিকে ঘিরে?

প্রভা চন্দ্রা: আমার মতে এটা একটা খুবই মৌলিক সমস্যা। তাই এক্ষেত্রে আমরা একজন মেয়ের জন্মাবস্থা থেকে শুরু করে তার বয়ঃসন্ধি কাল নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করি। আমার মনে হয় জীবনচক্রের এই পর্বটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর প্রতি যতটা নজর দেওয়া উচিত ততটা আমরা দিই না। অনেক পরিবারেই কন্যা সন্তানের জন্মের পরে কোন ধরণের আনন্দউৎসব হয় না। সেই সঙ্গে একটা পরিবারে একজন মেয়েকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত ততটা তো দেওয়া হয়ই না, উপরন্তু তার কাছে থেকে এমনসব প্রত্যাশা করা হয় যা একজন শিশুপুত্রের কাছ থেকে করা প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই আলাদা। এসব কারণে আমার মতে অনেক বাচ্চা বয়স থেকেই মেয়েরা নিজেদেরকে পরিবারের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে ভাবতে শুরু করে। এছাড়া পরিবারের মধ্যে মেয়েদের যে ভূমিকা পালন করতে হয় তাতে স্বাধীনতা থাকে না। মেয়েদের সম্পর্কে ভাবা হয় যে তারা খুব শান্তশিষ্ট স্বভাবের হবে, তারা কিছু দেখবে না, শুনবে না বা মুখ ফুটে বলবে না এবং বহু পরিবারের ক্ষেত্রে এটাই বাস্তবে ঘটতে দেখা যায়। আমার মতে এটাই একটা ক্ষেত্র যেখানে একজন মেয়ের মনে এই প্রবণতা গড়ে ওঠে যে একটা পরিবারের অঙ্গ হয়েও সে নিজের আত্মপরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে না...

সুব্রত বাগচি: তাহলে আপনি মেয়েদের যে কোনও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার জন্য তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা একপ্রকার অনিশ্চিত ব্যক্তিত্বের বোধকেই অন্যতম বলে মনে করছেন?

প্রভা চন্দ্রা: হ্যাঁ আমি এমনটাই মনে করি। কারণ এই মনোভাব থেকেই পরিবারে যে তাদের কোনও মূল্য বা দাম নেই, এমন কথা ভাবার প্রবণতা জন্মায়। আর এই  ঘটনার অবধারিত পরিণাম হিসেবে আমরা জানি যে মেয়েদের মধ্যে নির্যাতন, যৌন লাঞ্ছনা ঘটার সম্ভাবনা দেখা যায়। অল্পবয়সি ছেলেদের তুলনায় কমবয়সি মেয়েদের অনেক বেশি পরিমাণে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অন্যদিকে, এই ঘটনার ফলে যে প্রবণতার সৃষ্টি হয় তা হল তারা নিজের নির্যাতনের কথা পরিবারের  অন্যদের কাছে বলার চেষ্টা করে কিন্তু তা সম্ভব হয় না, বা যেটুকু নিরাপত্তা তার প্রাপ্য সেটুকু সে তার পরিবার থেকে পায় না; অথবা সে যদি মুখ ফুটে কাউকে জানায় তখনও তার কথা কেউ বিশ্বাস করে না। এর ফলে সে মানসিক আঘাত পায়, যা মানসিক সমস্যার প্রতি প্রবণতার দ্বিতীয় কারণ। আর যে পরিবারগুলো সুসংবদ্ধ হয় না, তাঁদের আবার আলাদা ধরণের সমস্যা হয়। বাড়ির অভিভাবকেরা  সন্তানদের সময় এবং সুরক্ষিত পরিবেশ দিতে পারেন না। এটা প্রবণতার তৃতীয় কারণ যা মেয়েদের এবং ছেলেদের ক্ষেত্রেও সমান। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে তো আগে থেকেই অন্যান্য প্রবণতার চাপ রয়েছে, তার উপর যখন এই পরিস্থিতি দেখা দেয় তখন সমস্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এরপর মেয়েদের জীবনে বয়ঃসন্ধির পর্যায় আসে। বয়ঃসন্ধি মেয়েদের জীবনে একটি ইতিবাচক সময়। তাদের জীবনের নানা স্তরে উন্নতি ঘটছে, সঠিক দিশায় তার জীবন এগোচ্ছে। কিন্তু হরমোনের কারণে এবং  মস্তিষ্কগতভাবে তাদের মধ্যে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যার ফলে তাদের মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট সমস্যার বাড়বাড়ন্ত হওয়ার প্রবণতা জন্মায়। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির মেয়েদের মধ্যে মানসিক অবসাদের পরিমাণ চারগুণ বেশি দেখা যায়। এটি সম্ভাবনার আকার বোঝায়...

সুব্রত বাগচি: বুঝেছি, তবে এই পর্বটা কতদিন ধরে চলতে পারে এবং এর জন্য কতখানি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন?

প্রভা চন্দ্রা: এটা ঠিক সেভাবে বলা মুশকিল...

সুব্রত বাগচি: কিন্তু একজন অনুশীলনরত চিকিৎসক হিসেবে আপনার নিশ্চয়ই একটা ধারণা রয়েছে, যেমন ৫০ শতাংশ মেয়েরা অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে...?

প্রভা চন্দ্রা: না, এটা ঠিক তেমন ব্যাপার নয়। এমন নয় যে বয়ঃসন্ধিকাল মেয়েদের অবসাদ হবেই এবং বয়ঃসন্ধির পরে এই অবসাদ চলতেও পারে আবার নাও চলতে পারে। কিন্তু এটা বলা যেতেই পারে যে ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে ৮০ অবধি মহিলাদের অবসাদ হওয়ার সম্ভাবনা পুরুষদের থেকে চারগুণ বেশি। তাই বয়ঃসন্ধিকাল অন্যান্য পর্যায়ের থেকে আলাদা। কারণ যাদের মধ্যে মানসিক অবসাদের প্রবণতা আগে থেকেই থাকে সেখানে বয়ঃসন্ধিকালীন হরমোনের কার্যকলাপ সেই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।  

সুব্রত বাগচি: তাহলে মোদ্দা কথা আপনি যা বলতে চাইছেন তা হল শিশু কন্যা বা মহিলাদের মধ্যে অবসাদ ও উদ্বেগের ঝুঁকি তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেশি থাকে।

প্রভা চন্দ্রা: এর পরে, আপনি মহিলাদের সন্তান জন্ম দেওয়ার পর্যায়টা সম্পর্কে যে প্রশ্নটি করেছিলেন। আমরা সবাই জানি যে একটা মেয়ে খুব ধরাবাঁধা পরিবেশে বড় হয়। একটা সময় পর্যন্ত তারা পড়াশোনা করে, তারপরে তাদের বিয়ে হয়। এবং কিছু শহুরে, শিক্ষিত মহিলা ছাড়া অধিকাংশকেই তাদের চেনা-পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে একদিন সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা পরিবেশে চলে যেতে হয়।

সুব্রত বাগচি: তাই সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করা, তাই তো।

প্রভা চন্দ্রা: হ্যাঁ, সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করা। তাই পুরনো সবকিছুকে ভেঙেচুড়ে নতুনভাবে গড়ার জন্য তাদের কাছে সমাজের প্রত্যাশা থাকে যে এই নতুন পরিবেশকে তারা রাতারাতি বা এক সপ্তাহের মধ্যেই গ্রহণ করে নিতে সক্ষম হবে।

সুব্রত বাগচি: একটি মেয়েকে তার জীবনের অচেনা-অজানা বিষয়গুলোকে অনবরত জোর করে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়।

প্রভা চন্দ্রা: একদম ঠিক বলেছেন এবং আমার মনে হয় এটা তাদের জীবনে মস্ত বড় একটা ঝুঁকির দিক। অনেক মেয়েই এমন মনে হতে পারে - কারণ তারা মনে করে যে এটাই তাঁদের ভাগ্য, যে সমাজের এটাই প্রথা, তাঁদের এমনই করার কথা – আর কোনোভাবে মানিয়ে নেয়। কিন্তু কোনও মেয়ের মধ্যে যদি আগেই ঝুঁকির মাত্রা বেশি থাকে তাহলে সেই মহিলার পক্ষে পরিস্থিতি সত্যিই খুব কষ্টকর। এর কারণে অনেকে অনেক দূরে সরে যায়। আমাদের দেশের প্রথাই হল যে মেয়েরা একবার স্বামীর সংসারে প্রবেশ করার পর স্বামীর পরিবারই তার পৃথিবী এবং সে আর তার বাবা-মায়ের উপর নির্ভরশীল হতে পারবে না; উল্টোদিকে তার বাবা-মায়ের বক্তব্য হল যে নতুন পরিবারেই মেয়েকে মানিয়ে-গুছিয়ে নিতে হবে। এই পরিস্থিতিতে পড়ে একজন মানুষের কী করার থাকতে পারে? আমি মাঝে মাঝে পুরুষদের কাছ থেকে জানতে চাই যে যদি তাদের এই কাজটা করতে হত, অর্থাৎ নিজের চেনা-জানা পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে হলে তাহলে তারা কি করবে?

সুব্রত বাগচি: এই বিষয়ে পশ্চিমি মহিলারা অনেক উন্নত জায়গায় রয়েছেন, তাই না?

প্রভা চন্দ্রা: হ্যাঁ, এইধরনের প্রবণতাগুলো তাদের জীবনে থাকে না বললেই চলে। এই বিশেষ ঝুঁকি বা প্রবণতাগুলো আমাদের দেশেরই বৈশিষ্ট্য। পশ্চিমি সভ্যতায় স্বামী-স্ত্রীকে সমান চোখেই দেখা হয়।

সুব্রত বগচি: আমাদের দেশে এই সমানাধিকারের ধারণা এখনও বহু যোজন
দূরে রয়েছে।

প্রভা চন্দ্রা: এবং এটাই তো সবচাইতে চ্যালেঞ্জিং বিষয়। আমাদের সমাজে একটা মেয়েকে যে শুধু স্বামীর পরিবারের সবার সঙ্গে মানিয়ে-গুছিয়ে নিতে হয় তা নয়। সেই সঙ্গে স্বামীও তো ওই মেয়েটির কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়। স্বামীরা তো স্ত্রীদের সহযোগী হয় না। সে অপরিচিত।

সুব্রত বাগচি: তাহলে ডঃ চন্দ্রা আমাকে বলুন যে প্রতিদিন যখন আপনি নিমহ্যান্সে চিকিৎসা করেন তখন আপনার কাছে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে কোন পর্যায়ের মানুষ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নিয়ে বেশি আসে?

প্রভা চন্দ্রা: এক্ষেত্রে সদ্য বিবাহিতাদের সংখ্যাই বেশি। এই পর্বের বহু অল্পবয়সি মহিলারা আমার কাছে আসে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় যে ২০ থেকে ৩০-৩৫ বছর বয়সি মহিলাদের সংখ্যাই বেশি থাকে। এই সময়টাতেই মেয়েদের বিয়ে হয়। এবং এই বয়সকাল হচ্ছে সেই সময় যখন মেয়েদের দু'-তিন বছর বিয়ে হয়েছে আর বিয়ের পরে স্বামীর পরিবারের লোকদের মনে হতে শুরু করে যে তাদের ঘরের বউ-এর কোনও সমস্যা আছে, তাই সে সংসারে মানিয়ে-গুছিয়ে নিতে পারছে না এবং এরকম কথাও শুনতে হয় যে 'বউ আমাদের কথা শোনে না', 'সে কিছু কাজকর্ম করতে পারে না' প্রভৃতি... গতকাল একজন ভদ্রলোক আমায় বললেন যে, তাঁর স্ত্রী নাকি স্বামীর জামার কলারটা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে পারে না। এই কারণেই তিনি মনে করেন যে তার স্ত্রীর কোনও সমস্যা আছে। একবার ভাবুন, স্ত্রীর কাছে প্রত্যাশার পরিমাণটা কত বেশি থাকে।

সুব্রত বাগচি: একথা শুনে মনে হচ্ছে মহিলার স্বামীরই সমস্যা আছে।

প্রভা চন্দ্রা: আপনি জানেন অনেকসময়ে পাহাড়প্রমাণ প্রত্যাশাগুলোর জন্য গায়ে তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়, যেমন- বাড়ির বউ-এর সম্পর্কে বলা হয় সে খুব নিড়বিড়ে, সে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে অক্ষম, তাই মানুষটার স্বভাবের থেকে তার কাজের ভালো-মন্দই এখানে বেশি গুরুত্ব পায়। অথবা তার কথা শোনা বা বোঝার চেষ্টাটুকুও করা হয় না। তাই আমার মনে হয় এই পর্বটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এবং কিছু জানা-বোঝার আগেই মেয়েটি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে। ফলে তার জীবনে ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়ে। এবং অবধারিতভাবে গর্ভাবস্থার উপর তার কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আজ আমার কাছে এসে একজন মহিলা বলে যে তার তিনমাস বিয়ে হয়েছে, এবং সে একজন ফার্মাসিস্ট। কিন্তু তার মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা আছে। এবং সে আমার কাছে এসেছে বাচ্চা হওয়ার পরামর্শ নিতে। তখন আমি তার কাছ থেকে জানতে চাই যে সে আদৌ মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত কিনা? সে উত্তরে বলে না, আমি মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত নই। কিন্তু আমার স্বামী, শাশুড়ি বাচ্চা চায়। তাই আমি তাদের কথামতো কাজ করছি। এই পরিস্থিতিতে মেয়েটির অবস্থা যে কতটা শোচনীয় হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ একদিকে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে মা হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। আবার অন্যদিকে তার মানসিক স্বাস্থ্যেরও সমস্যা আছে। তাই আমার মতে এগুলোও একপ্রকার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।

সুব্রত বাগচি: আমি আপনার কাছে সোজাসুজি জানতে চাইছি যে এমন একজন ব্যক্তি যার মানসিক সমস্যার রয়েছে, যেমন আপনার কাছে আসা ওই মহিলা যার কথা আপনি এইমাত্র বললেন, এর মত মহিলাদের কি উচিত বা এরা কি পারে অথবা এটা কি আদৌ বাঞ্ছনীয় এই ধরনের মহিলাদের সন্তানের মা হওয়া? বাচ্চার ক্ষেত্রেও কি ঝুঁকি থাকে যদি বাচ্চার একজন অভিভাবক (মা বা বাবা) বা দু'জন অভিভাবকেরই (বাবা এবং মা) মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা থাকে?

প্রভা চন্দ্রা: এক্ষেত্রে প্রথম হচ্ছে বিয়ে। আর দ্বিতীয় সমস্যা হল সন্তানের জন্ম দেওয়া। এখন কথা হল প্রত্যেকটা মানুষেরই জীবনসঙ্গী থাকার অধিকার রয়েছে। সেই সঙ্গে সব মানুষেরই নিজের সন্তান থাকার অধিকারও আছে। তাই আমার মনে হয় অধিকারের দিক থেকে দেখতে গেলে সবারই অধিকার রয়েছে। মানুষ বিয়ে করে কারণ তার জীবনে একজন ভালো সঙ্গীর প্রয়োজন। এই জীবনসঙ্গীরা একে অপরকে দেখভাল করবে, একসঙ্গে জীবনের অনেকটা সময় কাটাবে- এমনই ভাবনা থাকে তাদের। সেটা হল একটা পর্যায়ে। কিন্তু সামাজিক পর্যায়ে এটা অন্য কিছু। বিয়েটাকে সমাজে একটা সম্মানজনক বিষয় হিসেবে দেখা হয়। যদি কারোর বিয়ে হয় তখন সমাজ তাকে একটা মর্যাদা দেয়। তাই অনেক অভিভাবকরাই মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা গোপন করে তাদের বিয়ে দেয়। এবং পুরুষদের থেকে মহিলাদের ক্ষেত্রেই এই ঘটনা বেশি ঘটে। অনেক অভিভাবকরা ভাবে যে বিয়ে হয়ে গেলে...

সুব্রত বাগচি: সমস্যা সেরে যাবে

প্রভা চন্দ্রা: হ্যাঁ, তাই, কিন্তু এই ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। এবং দ্বিতীয় ধারণাটি হল…

সুব্রত বাগচি: সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

প্রভা চন্দ্রা: হ্যাঁ। কারণ মেয়েদের ঝুঁকির হার তো অনেকটাই বেশী। তাই তাঁরা হবু জামাইকে সমস্যার কথা জানানোর বিষয়টি এড়িয়ে জান। কারণ তাহলে কেউ মেয়েটিকে বিয়েই করবে না, উল্টে অবসাদ, মানসিক চাপ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করবে অথচ মূল সমস্যার বিষয়ে আলোচনা করবে না।

সুব্রত বাগচি: তাই কোনোমতে মেয়েটিকে অন্যের হাতে গছিয়ে দেয়।

প্রভা চন্দ্রা: আমি বোঝাতে চাইছি যে অভিভাবকরা মনে করে যে তারা যা করছে তাতে তাদের মেয়ের ভালোই হবে। অভিভাবকরা তাদের মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় থাকে এবং ভাবে যে তারা যখন পৃথিবীতে থাকবে না তখন কে তাদের মেয়েকে দেখাশোনা করবে। তাই তাদের মনে হয় যে যা তাঁরা করছে তা সঠিক।

সুব্রত বাগচি: আমাদের হাতে সময় কম, তাই - আমি আপনার কাছ থেকে জানতে চাই যে একটি কন্যা সন্তান এবং পরবর্তীকালে সেই মেয়েই যখন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী হয়ে ওঠে, সেই নারীর অবস্থার উন্নতির জন্য, বিশেষ করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকা ঠিক কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসক গোষ্ঠীর ভূমিকাই বা কীরকম হওয়া উচিত, যার সাহায্যে আজকের তুলনায় আগামিকাল যাতে আমরা এই সমস্যার মোকাবিলা অনেক সুষ্ঠু ও দৃঢ় ভাবে করতে পারি?

প্রভা চন্দ্রা: এক্ষেত্রে আমার প্রথমেই যা মনে হয় তা হল একটি কন্যা সন্তান জন্মানোর পর তার নিজের বাড়িতেই আগে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

সুব্রত বাগচি: মানে স্বীকার করা যে কন্যা সন্তানদের ক্ষেত্রে বিস্তর ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে আপনার যা জানালেন - বয়ঃসন্ধির আগের সময়টা। এই বয়সে তাকে মানসিকভাবে সঙ্কুচিত করা অন্যদের পক্ষে অনেক বেশী সহজ। সে বড় হতে থাকবে,  যৌন নির্যাতনের সহজ নিশানা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে।

প্রভা চন্দ্রা: আমার মতে মেয়েদের লালন করা, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা; সুনিশ্চিত করা যে যদি মেয়েদের কোনও সমস্যা হয় তাহলে তাকে এমন একটি পরিবেশ দেওয়া হবে যেখানে সে সমস্যার কথা আলোচনা করতে পারবে এবং তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হবে; সেই সঙ্গে তার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এমন পরিবেশ দেওয়া যেখানে সে ফুলের মতো ফুটে উঠতে পারবে। এই গেল প্রথম ধাপ। এরপর দ্বিতীয় ধাপ হল পরবর্তী সময়ে তার জীবনে যে ধরণের শারীরিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবর্তন আসবে সেগুলোর জন্য তাকে প্রস্তুত করতে হবে। যেমন- হরমোনগত পরিবর্তনের পাশাপাশি দক্ষতা বাড়ানো। সমস্যার সমাধান বা বিবাদ মেটানোর ক্ষেত্রে আমরা মেয়েদের সক্ষম করে তুলি না – মানে ছেলেদেরও করা হয়না – কিন্তু মেয়েদের এই বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত কারণ, যেমন আপনি আগে বললেন, পরিবারে মেয়েদের ভূমিকা মুখ্য, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মিটমাট করা, নিজের আবেগ-অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করা, নিজেকে শান্ত করতে, সুস্থ রেখে চলতে শেখা, কারণ জীবনে তাকে অনেক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। মাতৃত্বের জন্য মেয়েদের প্রস্তুত করাটাও আমার মতে গুরুত্বপূর্ণ। মানসিকভাবে অসুস্থ একজন মহিলাও মা হতে পারে। আমরা এমন অনেক পরিস্থতি দেখেছি যেখানে এমন মহিলারা মা রূপে অত্যন্ত সফল। মূল কথাটি হল তাদের তৈরি করা আর সুনিশ্চিত করা যে সে মা হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত। মহিলাদের বোঝাতে হবে যে সবরকম ঝুঁকি সত্ত্বেও যদি মহিলারা নিজে প্রস্তুত না থাকে, যদি সমাজ, সংসার বা স্বামীর চাপে তারা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে বাচ্চার জন্যও তা অত্যন্ত ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আমার মতে একজন মায়ের বিরাট ভূমিকা থাকে। মা শুধু গর্ভস্থ শিশুকে পৃথিবীর আলোই দেখায় না, সব বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করে ভবিষ্যতের সুস্থ নাগরিক গড়ে তোলে। তাই মহিলাদের জীবনে মাতৃত্বের পর্যায়ের উপর বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। এর সঙ্গে মহিলাদের স্বামীদেরও অত্যন্ত বড় ভূমিকা থাকে। জীবনসঙ্গী রূপে তার দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ।

সুব্রত বাগচি: এসব অমূল্য তথ্য আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। একটা বিষয়ে কিছু বলার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি। মহিলা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে বৃহত্তর সমাজের প্রতি আপনি ঠিক কী বার্তা দিতে চাইছেন? অথবা বৃহত্তর সমাজের মধ্যে অবস্থিত কোনও একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কি কোনো ভূমিকা আছে?

প্রভা চন্দ্রা: আমার মতে একজন মহিলার সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব আছে। কিন্তু যদি এক্ষেত্রে আমায় যে কোনও একটা বিশেষ শ্রেণি বা দলকে বেছে নিতে হয় তাহলে আমি পুরুষদের বাছব। কারণ নানারকম ভাবে একজন মহিলা একটা পুরুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এবং তারাই আবার ঝুঁকির কারণ। পুরুষদের জন্যই মহিলাদের মধ্যে সমস্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। পুরুষরা মহিলাদের সঙ্গী হয়, যার সঙ্গে সে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে বাবা, ভাই, সঙ্গী, স্বামী, ছেলে- প্রত্যেকেই আমার তালিকায় রয়েছে। যদি এসব পুরুষরা মহিলাদের প্রবণতাগুলো বোঝে তাহলে তারা মহিলাদের রাগ, উদ্বেগ, বিরক্তি, বা কিছু ব্যবহারের আপেক্ষিকতা নিয়ে বিব্রত বোধ না করে সমস্যাগুলোর কারণ বুঝে তা সমাধান করার চেষ্টা করতে পারবে। সে যা করছে তা কেন করছে, যা বলছে তার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে। মহিলাদের দুর্বলতা, অক্ষমতাগুলোর পরিবর্তে যদি তাদের শক্তি বা ভালো গুণগুলোর কদর করা হয় তাহলে মহিলারা সমাজে নিজেদের শক্তিশালী, স্থিতিস্থাপক হিসেবে প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হবে। এসবের বদলে যদি তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ, অবসাদগ্রস্ত প্রভৃতি তকমা দেওয়া হয় তাহলে একজন মহিলা চেষ্টা করবে জীবনে কোনওরকমে টিকে থাকতে। সে সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। আর আমার মতে এই লড়াই তখনই সফল হবে যখন একজন মহিলার পাশে একজন পুরুষের সহযোগিতার হাত থাকবে।

সুব্রত বাগচি: মানে ১৩০ কোটি মানুষের অর্ধেক মানে ৫০ শতাংশ লোকের সমর্থন পাওয়া। চলতিধারার উলটো স্রোতে চিন্তা করা কারণ মহিলাদের সমস্যাকে আমরা সবসময়ে তাদের একান্ত নিজস্ব সমস্যা বলে মনে করি। কিন্তু আপনি বলছেন এই সমস্যার সঙ্গে পুরুষদেরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে। এবং এভাবেই একটা নতুন আঙ্গিক অর্থাৎ নিউ ডাইমেনশন গড়ে উঠবে। আপনার মূল্যবান সময় আমাদের দেওয়ার জন্য আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ।

প্রভা চন্দ্রা: ধন্যবাদ। আমারও খুব ভালো লাগল।              

 

                                     

  

Was this helpful for you?