We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: ম্যানেজার বা সহকর্মীদের কি উচিত একজন বিপর্যস্ত কর্মীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো?

আপনার কি মনে পড়ে কখনও আপনি আপনার কোনও সহকর্মীর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটতে দেখেছিলেন? এমন কি কেউ ছিলেন যিনি তাঁর কর্মক্ষেত্রে খুবই সংগঠিতভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতেন, কিন্তু সহসাই তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং সঠিকভাবে কাজ করতেও অক্ষম হয়ে উঠেছিলেন? অথবা আপনার কোনও সহকর্মী কি প্রায়শই কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত হতে শুরু করেছিল বা নিজের ক্ষতি করার কথা বলত?

মানুষের আচরণে হঠাৎ বদল ঘটা কোনও না কোনও অনুভূতিগত বিপর্যয় বা মানসিক অসুস্থতাকে চিহ্নিত করে। এবং যে মানুষটি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় সে নিজের মুখে অন্যদের কাছে সাহায্য চাইতে কুন্ঠা বোধ করে। একটা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ম্যানেজার বা বিপর্যস্ত ব্যক্তিটির সহকর্মী হিসেবে একজনের উচিত সমস্যায় পড়া কর্মীটির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ও তার কথা মন দিয়ে শোনা।

বিপর্যয়ের লক্ষণ সবসময়েই দেখা যায়। তবে সেগুলো যে একেবারে প্রথমেই চোখে ধরা পড়বে, তেমন নাও হতে পারে। ম্যানেজার বা সহকর্মী হিসেবে সেই চিহ্নগুলোকে লক্ষ করা ও বিপর্যস্ত কর্মীটিকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে
আসা দরকার।

কখন একজন ব্যক্তি তার সাহায্যের হাত বিপর্যস্ত মানুষের দিকে বাড়িয়ে দেবে?

ম্যানেজার বা সহকর্মীদের তখনই সহায়তার হাত বাড়ানো প্রয়োজন যখন দেখা যাবে যে-

  • কারোর মধ্যে বর্ধিত ও অবর্ণণীয় জেদ দেখা দিচ্ছে
  • ব্যক্তিটি কাজ করছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে নিজের সেরাটুকু দিতে পারছে না
  • হঠাৎ বাহ্যিক চালচলনে যত্ন ও সুরক্ষার অভাব চোখে পড়া
  • প্রায়শই নিজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বা হারিয়ে যাওয়ার বোধ জাগা
  • প্রায়শই নিজের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলা
  • নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা দেখা দেওয়া
  • অগ্রগতির হার বাড়া-কমা
  • মনের মধ্যে সব বিষয়ে একটা বদ্ধমূল ধারণা গড়ে তোলা
  • আগের তুলনায় নিজের শক্তির হার বা মাত্রা কমে যাওয়া
  • আক্রমণাত্মক বা আক্রোশের মনোভাব প্রকাশ পাওয়া

যদি কেউ তার সহকর্মীর মধ্যে কমপক্ষে দু'সপ্তাহ ধরে উপরের লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনও একটা লক্ষ করে তাহলে তার উচিত ওই সহকর্মীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। অন্যদিকে সংস্থার ম্যানেজার হিসেবে যদি কেউ কোনও কর্মীর মধ্যে একনাগাড়ে কার্যগত উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, কাজের ক্ষেত্রে গড়িমসিভাব বা আক্রোশের লক্ষণ দেখতে পায় তাহলে ম্যানেজারের উচিত ওই কর্মীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা।

যখন কেউ বিপর্যস্ত মানুষটিকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে তখন তার উচিত সহযোগী, সহানুভূতিশীল, সহায়তা দানকারী হয়ে ওঠা। সেই সঙ্গে নিজের মতামত এবং অন্যকে হুমকি না দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। কর্মক্ষেত্রে মানসিক বিপর্যস্ত কর্মীর সঙ্গে তার সহকর্মী এবং ম্যানেজারের সহজ স্বাভাবিক আচরণ করা ও তাকে তার জীবনের সমস্যা নিজের মুখে বলার সুযোগ করে দেওয়া  দরকার। তাদেরকে এটা বোঝানো জরুরি যে সহকর্মী হিসেবে আপনি বা আপনারা নিজেদের মতামত না দিয়ে তাদের সমস্যা শুনতে আগ্রহী। এধরনের পরিস্থিতিতে ঠিক কীরকম আচরণ করা জরুরি সে সম্পর্কে কোনও বাধা-ধরা নিয়ম না থাকলেও সঠিক চিন্তাভাবনা এবং নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতা একান্তই প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আপনি আপনার বিপর্যস্ত সহকর্মীর সঙ্গে নিম্নলিখিতভাবে যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেন-

''কী বন্ধু, কাজকর্ম সব কেমন চলছে? কয়েকদিন ধরে আমার মনে হচ্ছে কোনও একটা বিষয় নিয়ে তুমি খুব ঝামেলার মধ্যে রয়েছে। আমি তোমায় নিয়ে বেশ চিন্তিত এবং সেই কারণে আমি তোমায় এটুকুই বলতে চাই যে তুমি যদি তোমার সমস্যার কথা আমায় বলতে চাও তাহলে আমি আমার সাধ্যমতো তোমায় সাহায্য করার জন্য পাশে আছি। তোমায় কোনওভাবে যদি আমি সাহায্য করতে পারি তাহলে আমার সত্যিই খুব ভালো লাগবে।

এমনও হতে পারে যে আমি তোমার সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হলাম না। কিন্তু, অনেকসময়ে নিজের সমস্যা অন্যকে বলতে পারলেও আমার মনে হয় মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। আমি জানি নিজের কথা বলার মতো বিশ্বাসযোগ্য কাউকে খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। তাই তুমি যদি মন খুলে নিজের সমস্যার কথা আমায় বলতে পার তাহলে আমার নিজেকে বেশ ভাগ্যবান বলে মনে হবে।''

মানুষ যদি খুব সামান্য পরিমাণে হলেও নিজেকে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারে তাহলেও সে তার মনের কথা অন্যকে খুলে বলতে সক্ষম হতে পারে। যদি দুটো মানুষ তাদের একইরকম অভিজ্ঞতার কথা পারস্পরিকতার মাধ্যমে ভাগ করে নেয়  বা কঠিন পরিস্থিতির কথা একে অপরকে মন খুলে বলতে পারে তাহলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আশ্বাস জন্মানো সম্ভবপর হয়। সেই সঙ্গে মানুষের মনে যদি অন্য কারোর মতামত শোনার ভয় না থাকে তাহলেও সে তার মনের কথা খোলাখুলি বলতে পারে।

কখনোই বিপর্যস্ত মানুষকে কোনও সময়েই হেয় করা উচিত নয় বা পারস্পরিক কথপোকথন শেষ হয় গেলে নিজেকে নিয়ে অথবা নিজের সমস্যা নিয়ে মশগুল হয়ে পড়া ঠিক নয়। তাদের দুর্বল বা শক্তিহীন বলে বিবেচনা করাও উচিত নয়। এবং তাদের কখনোই সান্ত্বনা বা প্রবোধ দেওয়াও ঠিক নয়। ''তুমি এরকম কোর না। যা কিছু ঘটেছে তা জীবনেরই অঙ্গ। তাই এসব নিয়ে না ভেবে খুশিতে থাক।'' বা ''আমি তোমার আচরণ দেখে খুবই ক্লান্ত বোধ করছি। তুমি অমূলক চিন্তাভাবনা করা বন্ধ কর এবং জীবনে সামনের দিকে এগিয়ে যাও।'' অথবা ''কান্নাকাটি থামাও। আমার মনে হয় তুমি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছ। নিজের দুর্বলতা জাহির কোর না।''- দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের প্রতি এসব মন্তব্য বা কথাবার্তা একেবারেই এড়িয়ে চলা জরুরি।

একটা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান কি পারে তার বিপর্যস্ত কর্মীকে সাহায্য করতে?

একজন সহকর্মী হিসেবে আপনি আপনার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আরেক সহকর্মীকে সংস্থার দ্বারা তৈরি ইএপি বা এমপ্লয়ি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের মাধ্যমে সহায়তা করতে পারেন। এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কোনও সংস্থার সেইসব কর্মচারীকে সাহায্য করা হয় যারা জীবনে মানসিকভাবে এবং স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে বিপর্যস্ত বা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে।

এমন কয়েকটি এমপ্লয়ি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম রয়েছে যার সাহায্যে সংস্থার কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা সমাধানের জন্য বিনামূল্যে স্বল্পমেয়াদি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও এই ব্যবস্থায় দৈনন্দিন জীবনযাপন  ও প্রাত্যহিক কর্মজগতের নানারকম বাধাবিপত্তি মোকাবিলার ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা দানের ব্যবস্থা রয়েছে।

এই পরিষেবায় গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়টা সুনিশ্চিত করা হয়। কিন্তু যদি কারোর মধ্যে নিজের বা অন্যের ক্ষতিসাধনের ঝুঁকি থাকে তাহলে সুরক্ষার কারণেই বিষয়টাকে আর গোপন রাখা যায় না। এই ব্যবস্থার ফলে কর্মীদের নিজেদের সমস্যা তার সংস্থা বা তাদের ম্যানেজারের কাছে খুলে বলার ক্ষেত্রে কোনওরকম ভয়ের কারণ থাকে না। সেই সঙ্গে কর্মীরা তাদের ব্যক্তিগত অথবা কর্মজীবন সংক্রান্ত যে কোনওরকম বিপর্যয় বা দুর্দশার মুখোমুখি হলেই এই ব্যবস্থার সুফল ভোগ করতে পারে।

আমার সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে ইএপি (এমপ্লয়ি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম)-র ব্যবস্থা নেই। সেক্ষেত্রে আমার কী করা উচিত?

এক্ষেত্রে সংস্থার ম্যানেজারের উচিত তার অসুস্থ কর্মীকে একটা কাউন্সেলিং এজেন্সি বা মনোবিদের কাছে কাউন্সেলিং করানোর জন্য সুপারিশ করা। এধরনের কাউন্সেলিং-এর খরচ সাধারণত সংস্থার কর্মীকেই বহন করতে হয়। অন্যদিকে প্রত্যেকটি সহকর্মী নিঃশর্তভাবে ও নিজেদের মতামত পোষণ না করে তাদের অসুস্থ সহকর্মীকে সাহায্য করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। সেই সঙ্গে যদি কোনও বিপর্যস্ত কর্মী কাউন্সেলিং-এর জন্য মনোবিদের কাছে একা যেতে দ্বিধা বোধ করে বা যেতে অক্ষম হয় তাহলে কোম্পানি সেই কর্মীর পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে।

এছাড়া অসুস্থ সহকর্মীর সমস্যা সমাধানের জন্য অন্যান্য সহকর্মীরা তাকে হেল্পলাইনের দ্বারস্থ হওয়ার জন্য পরামর্শ দিতে পারে।

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য ওয়ার্কপ্লেস অপশন-এর ক্লিনিক্যাল হেড বা প্রধান মল্লিকা শর্মার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।