হ্যাঁ, আমার একজন থেরাপিস্ট ছিলেন তবে আমার কোনও মানসিক রোগ ছিল না

 

যখন আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছিলাম তখন আমি প্রথমবারের জন্য একজন কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের কাছে যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিলাম। তখন আমার জীবনে খুবই দুঃসময় চলছিল এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চাকরির সুযোগও ক্রমশ কমে যাচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কাউন্সেলরের সঙ্গেই আমি সেই সময়ে যোগাযোগ করি। কিন্তু কাউন্সেলর সেদিন আমায় দেখবে বলে কথা দিয়েও কথা রাখেননি।

অবশেষে ২০১৩ সালে আমি ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলাম। সেই সময় ক্রিয়েটিভ আর্টস্‌ থেরাপি কোর্স, যাতে আমি ভর্তি হয়েছিলাম, তার শর্তানুসারে ডাক্তার বা থেরাপিস্টের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা হয়েছিল। প্রথমে যে চিকিৎসা-বিশারদের কাছে পরামর্শের জন্য গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে আমি ঠিকঠাক যোগাযোগ স্থাপন করে উঠতে পারেনি। তাই অগত্যা অন্য আরেকজন চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছিল এবং একবছরের কাছাকাছি সময় ধরে তাঁর কাছে আমি চিকিৎসা করেছিলাম।

এই বছরের গোড়ার দিকে আমি একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেব বলে সিদ্ধান্ত নিই। কারণ ছোটবেলায় ঘটা এক নির্যাতনের আতঙ্ক আমার জীবনে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। আসলে শৈশবে আমি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম। জীবন এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আমার মনে অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা নেওয়ার অন্তত মাসখানেক আগে আমি বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলাম।

গত বছর আমি একটা ড্রামা থেরাপির দলে যোগ দিয়েছিলাম। তারা মূলত সেই সব  মহিলাদের নিয়ে কাজ করে যারা ছোটবেলায় অযাচিত এবং অপ্রীতিকর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

ডাক্তার দেখানোর ক্ষেত্রে আমার সঙ্গী এবং কাছের বন্ধুরা আমায় খুবই সাহায্য করেছিল। আমি যে নিজের যত্ন ও মানসিক সুস্থতার প্রতি মনোযোগ দিয়েছি তা দেখে আমার অনেক বন্ধু আমায় প্রশংসাও করে। অন্যদিকে, আমার কিছু বন্ধু ও সহকর্মীর মনে এই নিয়ে নানারকম জিজ্ঞাসা বা ঔৎসুক্যও দেখা দিয়েছিল। এমন একটা সময় ছিল যখন আমি আমার বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম। কারণ তখন তাদের জীবনে খারাপ সময় চলছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার পরামর্শ শুনেছিল এবং ডাক্তার দেখানোর সুফলও উপলব্ধি করেছিল। তবে কয়েকজন আবার চিকিৎসকের কাছে যেতে অনীহা দেখায় বা রাজি হয়নি। কারণ তারা চেয়েছিল  ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনও উপায়ে নিজেদের জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে।

চিকিৎসার বিষয়ে আমাদের অনেকের মনেই নানারকম সংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। যদিও মানুষের মনের এই ধারণা আস্তে আস্তে বদলাচ্ছে। তবু একজন ভালো বা স্বীকৃত চিকিৎসকের সমস্যা এখনও রয়েই গিয়েছে। অনেক মানুষ মাত্র স্বল্প সময় চিকিৎসার কাজে নিযুক্ত থেকে নিজেকে একজন কাউন্সেলর বা চিকিৎসক হিসেবে দাবি করে। একবার এমনই এক চিকিৎসকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল যে বিশ্বাস করত সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে মহিলাদের সবসময়ে নিরীহ বা অবদমিত হয়ে থাকাই প্রয়োজন। আর এই বিশ্বাসের কথাই সে তার রুগিদের মধ্যে প্রচার করত। আমার এক বন্ধু ওই চিকিৎসকের সঙ্গেই আট মাস চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে নানারকম পরামর্শ করেছিল। এই ঘটনায় আমার বন্ধু এত খারাপ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল যে সে ভারতের আর কোনও চিকিৎসকের কাছে কখনও চিকিৎসা করাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

যদি আমরা চিকিৎসার বিষয়ে মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে পারি তাহলে আমার মনে হয় চিকিৎসার প্রতি মানুষের মধ্যে অনেক বেশি উৎসাহ জন্মাবে। এর সঙ্গে জরুরি চিকিৎসকদের যথাযথ স্বীকৃতি ও তাদের উপযুক্ত শংসাপত্র থাকার বন্দোবস্ত করা।

যখন আমার বন্ধুরা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা আমার সঙ্গে ভাগ করে নেয় তখন তাদেরকে আমি আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি। এবং এই লেখার মাধ্যমে আমি আমার অভিজ্ঞতা আরও অনেক মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাইছি যাতে চিকিৎসাকে ঘিরে মানুষের মনে যে অহেতুক সংস্কার রয়েছে তা যেন দূর হয়।

আমার এই বছরের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা এবং গত বছরে ড্রামা থেরাপি দলে অংশ নেওয়া- দুটোই আমায় অনেক সাহায্য করেছিল। আমার নিজেকে বোঝার ক্ষেত্রে এবং জীবনের পরিস্থিতিকে নানা আঙ্গিক থেকে বিচার করার বিষয়ে ওই অভিজ্ঞতা দুটো আমায় সমৃদ্ধ করেছিল। চিকিৎসা আমার মনের বিশ্বাসগুলোর সামনে অনেক প্রশ্ন তুলে ধরেছিল এবং নিজের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হতে সাহায্য করেছিল।

এক-একজন মানুষের জন্য এক-একরকম চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকরী হয়। যেমন আমার ক্ষেত্রে টক থেরাপির সঙ্গে আর্ট ও ড্রামা থেরাপি কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিল। আমি এটাও দেখেছি যে গ্রুপ থেরাপিও আমার পক্ষে যথেষ্ঠ ফলপ্রসূ হয়েছিল।

যখন আমার কোনও শারীরিক সমস্যা হয় তখন প্রাথমিকভাবে সুস্থ হওয়ার জন্য আমি ওষুধ খাই অথবা বিশ্রাম নিই। আর যদি এতে কাজ না হয় তাহলে ডাক্তারের কাছে যাই। মানসিক এবং অনুভুতিগত সুস্থতার ক্ষেত্রেও আমি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টাকে এই একইরকমভাবে বিচার করার চেষ্টা করি।

প্রবন্ধটি লিখেছেন পূজা রাও। ইনি একজন ইঞ্জিনিয়ার। সাত বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ডেভলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করছেন। সমানাধিকারের একজন শক্তিশালী সমর্থক পূজা। বর্তমানে তিনি ভারতের একটা অনলাইন সংস্থা এনাবেল ইন্ডিয়া-তে কাজ করছেন। এই সংস্থা প্রথম অক্ষম মানুষদের সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা  শুরু করেছিল।       

  

     

Was this helpful for you?

প্রস্তাবিত