অন্যের জায়গায় নিজেকে রেখে আপনি দ্বন্দ্ব মেটাতে পারেন

থেরাপিস্ট হিসেবে আমি প্রায়শই এমন সব রুগিদের দেখা পাই যাদের সঙ্গে সরাসরি বা প্রত্যক্ষ আলাপ-আলোচনার পরিবর্তে পরোক্ষ আলাপ-আলোচনাই বেশি কার্যকরী হয়। সরাসরি কাউন্সেলিং-এ একজন সাইকোলজিস্ট বা মনোবিদ রুগিকে প্রত্যক্ষভাবে বা সামনাসামনি পরামর্শ দেন এবং রুগি তাঁর পরামর্শের উপর নির্ভর করে যথোপযুক্ত চিকিৎসা করাতে উদ্যোগী হয়। অন্যদিকে অপ্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থায় রুগিকে মনোবিদের পক্ষ থেকে কিছু পরামর্শ দেওয়ার বদলে রুগিরা সাইকোলজিস্টদের কাছে থেকে সাহায্য নিয়ে নিজেরাই নিজেদের সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।

রুগিরা যখন নিজেদের সাইকোলজিস্টদের থেকে দূরে রেখে নিজেদের চিকিৎসা নিজেরাই করার চেষ্টা করে বা অন্যের চোখ দিয়ে নিজেদের দেখার, বোঝার চেষ্টা করে তখন তারা নানারকম কৌশল অবলম্বন করতে পারে। এমনই একটা কৌশল হল খালি বা শূন্য-চেয়ার (এম্পটি-চেয়ার টেকনিক) কৌশল। অনেকসময়ে একে দ্বৈত-চেয়ার (ডাব্‌ল-চেয়ার টেকনিক) কৌশলও বলা হয়। এই কৌশলের সাহায্যে মানুষের পারস্পরিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা যায়। এর সাহায্যে রুগিরা তাদের সমস্যা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করে এবং তারা তাদের আচরণ বা অনুভূতির অস্বাভাবিকতাগুলোর কারণ খুঁজে বের করতে চায়।

এই প্রক্রিয়ায় একটা খালি চেয়ারকে রুগি যেখানে বসে রয়েছে তার উল্টোদিকে রাখা হয়। ওই খালি চেয়ারটাকে একজন মানুষ বা একটা বিশেষ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করে রুগি নিজেই তার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। রুগি ওই চেয়ারের সঙ্গে কথা বলে, তাকে প্রশ্ন করে, নিজের অনুভূতি ও ধারণা ব্যাখ্যা করে। এরপর ওই ব্যক্তিই (রুগি) আবার খালি চেয়ারটাতে বসে (যেন মনে হয় অন্য কেউ বসে কথা বলছে) নিজের করা প্রশ্নের উত্তর দেয়। এই কথোপকথনের মাধ্যমেই রুগি অনেকবার দুটো চেয়ারে বসে একাই দু'জন মানুষের ভূমিকা পালন করে। এই প্রক্রিয়ায় একজন মনোবিদ বা কাউন্সেলর যেভাবে রুগির সঙ্গে কথাবার্তা বলে পারস্পরিক মত বিনিময় করত ঠিক তেমনই কার্যকলাপ করার চেষ্টা করা হয়।

এই কৌশলের উদাহরণ হিসেবে একজন মাঝবয়সি গৃহবধূকে বেছে নেওয়া হল যাঁর মধ্যে অল্প পরিমাণ মানসিক অবসাদের প্রবণতা রয়েছে। ঘরদোর পরিষ্কার এবং গোছানোর বিষয়ে এই মহিলার নিজের কাছে নিজের একধরনের অবাস্তব উচ্চাশা ছিল। তিনি সবসময়ে নিজেকে এই কাজে পুরোদস্তুর সক্ষম বলে ভাবতেন। এমনকী, তাঁর যদি ঘরের কাজে কখনও মন নাও বসত তাহলেও তিনি প্রতিদিন অনেকটা সময় নিজের ঘর, ছেলে-মেয়েদের ঘর, যা ব্যবহার করাই হয় না এবং গ্যারাজ প্রভৃতি নিজে পরিষ্কার করতেন। উনি সবসময়ে এটাই প্রমাণ করতে চেষ্টা করতেন যে তাঁর জীবনটা ঘরদোর পরিষ্কার করার জন্য নিবেদিত। এই গৃহবধূটি ছোটবেলায় তাঁর মায়ের কাছে ঘর-গৃহস্থালি কাজের গুরুত্বের কথা শুনেছিলেন। তাঁর মা এই কাজের উপর খুবই জোর দিতেন এবং মেয়েকে বলতেন যে সে যদি ভবিষ্যতে তার স্বামী এবং সন্তানের চোখে সম্মানিত হতে চায় তাহলে তাকে ঘরের কাজে একেবারে সেরা হয়ে উঠতে হবে।

এক্ষেত্রে ওই গৃহবধূর আত্মবিশ্বাসহীনতা ও আত্মনির্ভরতার অভাব কাটানোর জন্য অন্য যে কোনও সাইকোথেরাপির কৌশল ব্যবহার করার পরিবর্তে 'দ্য এম্পটি চেয়ার টেকনিক' (খালি-চেয়ার কৌশল)-এর সাহায্য নেওয়া যায়। ওই মহিলা (রুগি) খালি চেয়ারে বসে নিজেকে তার মা বলে মনে করে নিজের কাছে নানারকম প্রশ্ন করতে পারে এবং ঘরের কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে নিজের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারে। মায়ের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তিনি নিজের কাছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা যে একপ্রকার স্বর্গীয় সুখের কাজ এবং সেজন্য একজন ভালো বউ নিজেকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে ফেলতে পারে বলে ব্যাখ্যা করতে পারেন। তারপর আবার অন্য চেয়ারে বসে তিনি 'নিজের' ভূমিকা পালন করতে পারেন ও তাঁর মায়ের কথার উত্তর দিতে পারেন। এক্ষেত্রে তাঁর উওরের মধ্যে রাগ ও বিদ্বেষ জমা থাকতে পারে এবং তাঁর উত্তর নেতিবাচক অর্থাৎ সে তার মায়ের কথা মতো কাজ করতে না চাইতে পারে। এই কাজে তাঁর ক্লান্তির কথা তিনি নিজেকে বলতে পারেন। অথবা অন্যের ভালো লাগার জন্য কোনও কাজ করার ক্ষেত্রেও তাঁর ক্লান্তির কথা নিজের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।

এই কথপোকথন চলাকালীন ওই রুগি উপলব্ধি করতে শুরু করবেন যে তাঁর এই আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা তাঁর জীবনে অনেক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। তিনি এটাও  স্বীকার করবেন যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ হিসেবে তাঁর এখন নিজের পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা রয়েছে। এর সঙ্গে তিনি এটাও উপলব্ধি করতে পারেন যে বিগত বছরগুলোতে তাঁর অভিজ্ঞতা, অনুভূতির কথা কখনও তিনি তাঁর মাকে বলতে পারেননি। সবকিছু তিনি শুধু নীরবে সহ্য করেছেন।

এই উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে যে কীভাবে এম্পটি চেয়ার টেকনিক-এর সাহায্যে একজন রুগি অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির সংস্পর্শে আসতে পারে বা অপরের সামনে নিজের মতামত প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। বৃহত্তর ক্ষেত্রে এই কৌশল প্রয়োগ করার জন্য আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটা নিজস্ব সমস্যা, বিষণ্ণতা বা রাগের অনুভূতি বা পারস্পরিক সম্পর্কজনিত দ্বন্দ্ব বা বিবাদ মেটাতে এই এম্পটি চেয়ার টেকনিক ব্যবহার করতে পারি। এই কৌশলকে যথেষ্ট কার্যকরী ও শক্তিশালী হিসেবেই মনে করা হয়ে থাকে। শুধুমাত্র কাউন্সেলিং-এর প্রক্রিয়া হিসেবেই নয়, বিরূপ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের মুক্ত করা এবং নিজস্ব সমস্যা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে, তা সমাধানের জন্য এই কৌশলের ব্যবহার আমাদের সহায়তা করতে পারে।

এই বিষয়ে আরও জানার জন্য পাঠকরা পড়তে পারেন- Facilitating Emotional Change: The Moment-by-Moment Process by Leslie Greenberg, Laura Rice and Robert Elliott.

প্রবন্ধটি লিখেছেন দিল্লির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডঃ গরিমা শ্রীবাস্তব। ইনি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সাইন্সেস থেকে পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছেন।