যখন ভূমিকা বদলে যায়: সন্তানদের উপর বয়স্ক অভিভাবকদের দেখভালের দায়িত্ব
পরিচর্যা

যখন ভূমিকা বদলে যায়: সন্তানদের উপর বয়স্ক অভিভাবকদের দেখভালের দায়িত্ব

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

বার্ধক্য মানুষকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করে। দৈহিকভাবে মানুষ অসমর্থ হয়ে পড়ে; ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা কমে যায়, হাড় ও পেশির শক্তি ক্ষয় হতে শুরু করে, দৃষ্টিশক্তিও দুর্বল হতে থাকে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রমশ বিকল হতে শুরু করে এবং এর ফলে মানুষ জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপও ক্রমে ক্ষীণ হতে থাকে; এই কারণে বয়স্কদের মধ্যে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, বোধগম্যতা হ্রাস পায়। ঘুমের ধরন বদলে যাওয়া বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা দেয় এবং এর প্রভাবে তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিঘ্ন ঘটে।

বয়স্ক মানুষরা তাদের শারীরিক ও বৌদ্ধিক সক্ষমতাগুলোকে হারিয়ে না ফেলার চেষ্টা করে। যদি তাদের মধ্যে দৈহিক বা চেতনাগত সমস্যা দেখা দেয় তাহলে তারা নিজের উপরে নির্ভরতা হারিয়ে ফেলতে শুরু করে (এই ঘটনা হঠাৎই ঘটে)।  সামাজিক জীবনাযাপনে বিঘ্ন ঘটে, নিজেরা কোনও কাজকর্ম করতে পারে না। ফলে তাদের চারপাশে থাকা মানুষজনের উপর তারা খুব বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

যদি কোনও বয়স্ক মানুষের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতা না থাকে তাহলে পরিবেশের  সঙ্গে তার মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে এবং এই প্রক্রিয়া অনেকদিন ধরে চলতে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে শারীরিক কারণে একজন বৃদ্ধ মানুষের জীবনযাপনে বড়সড় পরিবর্তন ঘটে বা হঠাৎই তারা পরিবারের অন্য সদস্যদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে পরিচর্যাকারীদের পক্ষে সময়োচিত ব্যবস্থা নেওয়া খুবই কষ্টসাধ্য হয়। এই মানসিক চাপ যে শুধু বোঝা তাই নয়, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক বোঝা এবং অনুভূতিগত চাপও পরিচর্যাকারীর উপরে এসে পড়ে। বয়স্ক মানুষের এই ক্রমবর্ধমান বা হঠাৎ ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যের জন্য তাদের মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যজনিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।

আপনার অভিভাবকের যত্নের ব্যবস্থা করা

যখন কারোর বয়স্ক বাবা-মা বা অভিভাবকরা অসুস্থ থাকে তখন তাদের দেখভাল  করা খুবই কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, যেমন- দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে নতুন করে পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করা, ঘরে-বাইরে কাজের চাপ, টাকাপয়সা জোগাড় করা এবং হাসপাতালে যাওয়া-আসা করা বা চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা। এসব কাজ একজন মানুষকে তার প্রাত্যহিক কাজকর্ম সামলে করতে হয়।

পরিচর্যার কাজ মানসিক দিক থেকেও কষ্টসাধ্য। কারণ নিজের অনুভূতির চারপাশে তখন অভিভাবকের যত্নের বিষটাই ঘিরে থাকে। যদি সন্তানদের হাতে পর্যাপ্ত সময় না থাকে তাহলে তাদের পক্ষে পরিচর্যার কাজ ক্রমশ বোঝা হয়ে ওঠে। তখন তা আরও একটা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যদি কোনও সন্তান এইসময়ে তার বাবা-মায়ের থেকে দূরে থাকে তাহলে তাকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে আসা বা তাদেরকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অথবা অসুস্থ অভিভাবকদের জন্য একজন পেশাদার পরিচর্যাকারীর ব্যবস্থা করাও জরুরি। অনেক পরিচর্যাকারীকেই এইসময়ে এমন সাংস্কৃতিকগত এবং সামাজিকভাবে নানারকম বোঝা নিতে হয় যা মূলত একজন অসুস্থ বাবা-মায়ের ছেলে-মেয়েরই নেওয়ার কথা থাকে। পারিবারিক গতিশীলতা বাধা পায়। সেই সঙ্গে পরিবারের উপর চাপ এসে পড়ে। যদি সন্তানরা বহু যুগ পরে অভিভাবকদের সঙ্গে থাকতে শুরু করে তাহলে তাদের ব্যক্তিগত ও ব্যবহারিক জীবনে নানারকম পরিবর্তনের সঙ্গেও সন্তানদের মানিয়ে নিয়ে চলতে হতে পারে।

কয়েকজন পরিচর্যাকারী রুগির যত্নের ক্ষেত্রে তেমন সক্রিয় থাকে না। অনেকে আবার অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। সন্তানরা তাদের অভিভাবকদের সবদিক থেকেই দেখভাল করে। কারণ বয়স্ক অভিভাবকরা নিজেদের উপর নির্ভরতা হারিয়ে ফেলে।

স্নায়ুমনোরোগ বিশেষজ্ঞ (নিউরোসাইকোলজিস্ট) তানভি মাল্য বয়স্ক মানুষদের যত্ন পরিষেবার পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। তাঁর মতে, ''বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে সম্মান হারানোর ভয় তাদের মানসিক সমস্যার একটা বড় অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সমস্যাটাই আমাদের প্রতিনিয়ত ভোগ করতে হয়।'' তানভি আরও বলেছেন, ''সন্তানরা যখন অভিভাবকদের পরিচর্যাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তখন অভিভাবকদের অনুভূতির সঙ্গে নিজেদের অনুভূতির সাযুজ্য বজায় রাখাটা তাদের পক্ষে অবিশ্বাস্যভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও তাদের হাতে বদলে যাওয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ সময়ও থাকে না।''

পরিচর্যাকারী হিসেবে একজন মানুষের কী করণীয় থাকে

বয়স্ক অভিভাবকদের পরিস্থিতির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি- মানুষের যখন বয়স হয় তখন তার আত্মনির্ভরতার বোধ হারিয়ে যেতে শুরু করে এবং সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তখন খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। মনোবিদ গরিমা শ্রীবাস্তবের মতে, ''একজন মানুষ যে বহু বছর ধরে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করেছে সে যদি বয়স হলে অন্য কারোর প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাহলে তা মানিয়ে নেওয়া তার পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়ে ওঠে। আসলে নির্ভরতা হারিয়ে যাওয়ার জন্য কোনও প্রস্তুতিই যথেষ্ঠ নয়। এর ফলে মানুষের মানসিকভাবে অস্থিরতা বাড়ে। এবং একজন পরিচর্যাকারীর পক্ষে এটা উপলব্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।''

খোলাখুলি কথপোকথন দরকার- বয়স্ক অভিভাবকরা কীভাবে তাদের বদলে যাওয়া জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা দরকার। সেই সঙ্গে তাদের দেখভালের জন্য যা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সে সম্পর্কেও তাদের জানানো উচিত। এছাড়াও তাদের অন্যান্য প্রয়োজনের দিকেও খেয়াল রাখা দরকার।

তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে সাহায্য করা- টাকাপয়সার উপর যাতে বয়স্ক অভিভাবকদের যতদূর সম্ভব নিয়ন্ত্রণ থাকে সে বিষয়ে তাদের সহায়তা করতে হবে; এর জন্য তাদের আশ্বস্ত ও নিরাপত্তা দিতে হবে। তারা যাতে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নানারকম কাগজপত্র, পাসবুক, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড প্রভৃতি ব্যবহার করার সুযোগ পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

নতুন পরিবেশে তাদের পাকাপাকি বসবাস করার জন্য সহায়তা করা- স্বাস্থ্যের কারণে যদি বয়স্ক অভিভাবকদের বাসস্থান বদল করার প্রয়োজন হয় তাহলে নতুন জায়গার সঙ্গে তাদের মানিয়ে নিতে সাহায্য করা জরুরি। এই বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা ও পছন্দ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। নতুন বাসস্থানে তাদের পরিচিত জিনিসপত্র রাখা প্রয়োজন (যেমন- আসবাবপত্র, ছবি প্রভৃতি)। যাতে তারা নতুন পরিবেশে গিয়ে পুরনো বাসস্থানের স্বাচ্ছন্দ পেতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা করা দরকার।

তাদের প্রয়োজনীয়তাগুলো বুঝতে হবে- আপনার প্রিয়জনের প্রয়োজনীয়তাগুলো বুঝতে হবে এবং তাদের চাহিদার সঙ্গে নিজের চিন্তাভাবনার পার্থক্যও বোঝা  দরকার। এজন্য তাদের মৌখিক ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের বিষয়েও ওয়াকিবহাল হতে হবে। যেমন- বৃদ্ধ বয়সে মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়। তখন তারা দিনে দু'বার দাঁত মাজতে নাও চাইতে পারে; আর এটা তাদের সাধারণভাবে সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে খুব বেশি পার্থক্য তৈরি করে না। তাই যখন বয়স্ক মানুষ দিনে দু'বার দাঁত  ব্রাশ করতে না চায় তখন যদি পরিচর্যাকারীরা তাদের তা করার জন্য জোর করে তাহলে রুগির মানসিক উদ্বেগ জন্মানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে- প্রায়শই পরিচর্যাকারীরা তাদের অভিভাবক বা বাবা-মাকে এমনভাবে দেখভাল করে যাতে মনে হয় যে তারা যেন কোনও ছোট বাচ্চাকে যত্ন করছে। কিন্তু বাচ্চাদের দেখভালের সঙ্গে বৃদ্ধদের যত্ন করার মধ্যে একটা গুরুতর পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত বাচ্চারা যখন বড় হতে শুরু করে তখন তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি বা দক্ষতা বাড়তে থাকে এবং ভবিষ্যতে তারা স্বাধীন হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, মানুষের যত বয়স বাড়ে তত তার শক্তি কমতে থাকে, কম বয়সের সক্ষমতা, দক্ষতার ক্ষয় হতে শুরু করে এবং নিজেরা নিজেদের যত্ন নিতে পারে না। তাই তাদের জন্য এমন নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি যাতে তাদের ক্ষমতাকে স্বীকৃতি জানানো এবং যে কাজে তারা স্বস্তি বোধ করছে না সেই কাজ তাদের জোর করে না করানো উচিত। অর্থাৎ তাদের পাশে এমনভাবে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে যাতে তারা নিজেদের অসহায়, অক্ষম না ভাবে।

তাদের প্রাপ্য সম্মান সুনিশ্চিত করতে হবে- পরিবারের পক্ষ থেকে নেওয়া যে  কোনও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই বয়স্ক অভিভাবক বা বাবা-মাকে শামিল করা জরুরি। তারা যদি পরিবারের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনায় নিজেদের যুক্ত করতে চায় তাহলে তারা যতদিন সেই কাজ করতে সক্ষম থাকবে ততদিন তাদের সহায়তা করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে পারবে এবং অন্যদের কাছ থেকে সম্মানও আদায় করতে সক্ষম হবে।

অভিভাবকদের জন্য নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে- উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যখন তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে তখন তাদের পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা উচিত। যদি তাদের জন্য পুরনো ডাক্তার ছেড়ে নতুন ডাক্তারের সন্ধান করা হয় তাহলে সে বিষয়ে তারা কী ভাবছে, স্বচ্ছন্দ বোধ করছে কিনা বা তাদের মনে কোনও চিন্তাভাবনা রয়েছে কিনা, সেসব নিয়ে তাদের মতামত শুনতে হবে, তাদের সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে হবে।

বয়স্কদের সঙ্গে বেশ কিছু সময় কাটানো জরুরি- পরিচর্যার কাজে অনেক সময়, অর্থ ও শক্তি ক্ষয় হয়। তাই বয়স্ক অভিভাবকদের সন্তানরা যদি বাইরে থেকে টাকার বিনিময়ে কোনও পরিচর্যাকারীকে ভাড়া করে তাহলে সন্তানরা বাবা-মায়ের সঙ্গে অনেক সময় কাটানোর সুযোগ পাবে।

সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করা প্রয়োজন- সামাজিক মেলামেশা বয়স্কদের অসুস্থতা কাটিয়ে অনেকাংশে সুস্থ হতে সহায়তা করে থাকে। নানাভাবে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার ব্যবস্থা করা সম্ভব, যেমন- পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধব ছাড়াও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাড়ির আশপাশের পার্কে মেলামেশার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে বয়স্কদের মধ্যে একাকিত্বের বোধ দূর করা সম্ভব হয়।    

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org