শিশু ও বয়ঃসন্ধিদের অবসাদ এবং উদ্বেগ

শিশু এবং বয়ঃসন্ধিদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগের চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া

অ্যাটেনশন ডেফিশিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডারের (এডিএইচডি) মতো অবসাদ ও উদ্বেগও শৈশবের একপ্রকার মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, যার লক্ষণ সবসময়ে খালি চোখে ধরা পড়ে না। এই সমস্যার কারণে একটা বাচ্চার আচার-আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দেয়। অভিভাবকদের চোখে সেই পরিবর্তন নাও ধরা পড়তে পারে।

বাচ্চাদের মধ্যে অবসাদ, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা হলে তারা নিজেদের অনুভূতি বা বোধের প্রকাশ ঘটাতে পারে না।

একজন বয়ঃসন্ধি ছেলে বা মেয়ের মধ্যে মানসিক অবসাদের লক্ষণ দেখা দিতে পারে তাদের ১১ বা ১২ বছর বয়সে। এই পর্যায়টা হল সন্ধিক্ষণের, যখন একজন বাচ্চার মধ্যে শারীরিক, মানসিক এবং হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে। অভিভাবক এবং শিক্ষক, যাঁরা বাচ্চাদের এই বদলগুলো দেখতে পান, তাঁরা অধিকাংশ সময়ে ওই লক্ষণগুলোকে এড়িয়ে যান। তাঁরা ভাবেন যে, বাচ্চা হয়তো কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যেই স্বাভাবিক অবস্থানে পৌঁছে যাবে। অন্যদিকে বাচ্চারা যত বড় হতে শুরু করে তত তাদের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন হতে থাকে। কিছু বাচ্চার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাও দেখা দেয়, যা মোটেই এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। এক্ষেত্রে অভিভাবকরা যদি দেখেন বাচ্চার আচার-আচরণ স্বাভাবিক হচ্ছে না এবং সেই আচরণ ২ থেকে ৩ সপ্তাহ ধরে স্থায়ী হচ্ছে তাহলে অবশ্যই তাদের বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

শিশু ও বয়ঃসন্ধিদের মধ্যে উদ্বেগজনিত সমস্যা

শিশুদের ক্ষেত্রে নানারকম গুরুতর উদ্বেগের সমস্যা দেখা দেয়। একদম ছোট বাচ্চা যারা সবে হাঁটতে শিখেছে এবং এর থেকে আরেকটু বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এরকম উদ্বেগের সমস্যা খুব বেশি দেখা যায়। যদি এই সমস্যা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ৫ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং তার দৈনন্দিন কাজে সেই সমস্যার প্রভাব পড়ে তাহলে একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা অবশ্যই প্রয়োজন।

সামাজিক উদ্বেগজনিত সমস্যা: সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে বাচ্চারা অধীর হয়ে ওঠে।

ভয়জনিত (ফোবিক) উদ্বেগ: বাচ্চাদের মনে কতগুলো বিশেষ বিষয় নিয়ে ভয় দেখা দেয়। যেমন- কোনও জায়গা, উচ্চতা, জীবজন্তু, অন্ধকার প্রভৃতি।

বিচ্ছিন্নতাজনিত (সেপারেশন) উদ্বেগ: বাচ্চাদের মনে মাঝে মাঝে ভয় হয় যে তারা হয়তো অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে। ২ থেকে ৩ বছরের বাচ্চাদের মধ্যে এই ভয় দেখা দেয়।

বয়সে একটু বড় ও বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পড়াশোনার সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ জাগে।

পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ: এই উদ্বেগের কারণ হল নিজের জীবনের প্রত্যাশা পূরণ ও লেখাপড়ায় সবসময়ে সফল হতে চাওয়া। এই সমস্যা বয়ঃসন্ধিকালের সেই সব ছেলে-মেয়ের মধ্যে দেখা যায়, যারা লেখাপড়ায় শুধুই সেরা হতে চায়। কারণ তাদের মনে ভয় থাকে যে যদি তারা পড়াশোনায় সেরা হতে না পারে তাহলে তারা তাদের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলবে। অন্যদিকে সেই সব ছেলে-মেয়েদের মধ্যেও ভয় থাকে যারা লেখাপড়ায় তেমন ভালো নয়। এরা সবসময়ে নিজেদের ব্যর্থতার জন্য হীনম্মন্যতায় ভোগে। বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েদের মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই উদ্বেগ জন্মায়। তাদের মনে বারবার কয়েকটি চিন্তা ঘুরেফিরে আসে- যদি আমি ব্যর্থ হই তাহলে কী হবে? যদি আমি জীবনে কিছু করে দেখাতে না পারি তাহলে কী হবে? যদি আমি তেমন ভালো কিছু করতে না পারি তাহলে কী হবে? আমি কি সব ক্ষেত্রেই সফল হব? 

শিশু ও বয়ঃসন্ধিদের মধ্যে মানসিক অবসাদ

এখন প্রতিযোগিতার জগৎ। তাই বাচ্চাদের উপর পড়াশোনা এবং অন্যান্য গুণাবলি বিকাশের জন্য অহেতুক ও অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ কারণে একজন বাচ্চাকে কড়া নিয়মকানুন ও কঠিন রুটিন মেনে চলতে হয়। এটা একজন বাচ্চার মানসিক অবসাদের পিছনে অন্যতম কারণ। তাকে বাড়িতে ও স্কুলে বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয় লেখাপড়া ও কিছু না কিছু শেখার মধ্য দিয়ে। সেই সঙ্গে অন্যান্য আরও কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক উপাদান থাকে যা একজন শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। যে সব বাচ্চারা তাদের অনুভূতিগত ও মানসিক জটিলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে না তাদের ক্ষেত্রেই অবসাদের সমস্যা বেশি চোখে পড়ে।

যে যে কারণে অবসাদ হতে পারে সেগুলো হল-

  • বাড়িতে ঝগড়া-বিবাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, যেমন- অভিভাবকরা যদি মদ্যপ হয় বা নিজেদের মধ্যে সবসময়ে ঝগড়া-বিবাদ করে
  • হিংসা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন বা অবহেলার কারণে মানসিকভাবে আতঙ্ক জন্মায়
  • পড়াশুনা শেখার সমস্যা যা একজন বাচ্চার আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতার উপর
    প্রভাব ফেলে
  • চিকিৎসা হয়নি এমন অন্যান্য সাইকিয়াট্রিক সমস্যা, যেমন- উদ্বেগজনিত জটিলতা

বাচ্চাদের মধ্যে কম, মাঝারি বা গুরুতর অবসাদ দেখা যায়।

কম অবসাদ- এর ফলে শিশু অখুশি থাকে। কিন্তু তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। স্কুলের কাজ বা দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে তাদের তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। কিন্তু অভিভাবকদের সাহায্য এবং সরল জীবনযাত্রা শিশুদের এই সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে।

মাঝারি অবসাদ- এর ফলে বাচ্চাদের জীবন অনেকটা প্রভাবিত হয়। বাচ্চারা সবসময়ে বিষণ্ণ ও মনমরা থাকে। যদি অভিভাবকরা বাচ্চার মধ্যে এরকম  অবসাদের লক্ষণ দেখতে পান তাহলে অবিলম্বে পারিবারিক চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে ও একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

গুরুতর অবসাদ - এর ফলে বাচ্চারা নিজেকে অপদার্থ বলে ভাবে। বাচ্চাদের মনে  সবসময়ে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা হয় এবং সে তার দুঃখগুলোর সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে না। যদি বাচ্চার মধ্যে এরকম গুরুতর মানসিক অবসাদ দেখা দেয় তাহলে তাকে তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখাতে হবে ও চিকিৎসা করাতে হবে।

বাচ্চাদের অবসাদ চিহ্নিত করার উপায়

আট বছরের কম বয়সি অবসাদগ্রস্ত বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নীচের আচরণগুলো প্রকাশ পায়-

  • খিটখিটে ভাব
  • অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীদের সঙ্গে একেবারে সেঁটে থাকা
  • মাঝে মাঝেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়া
  • খাদ্যাভ্যাস বা ঘুমের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন
  • স্কুলে যেতে না চাওয়া; পড়াশোনায় আগ্রহ হারানো
  • বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে না চাওয়া
  • মাঝে মাঝে পেটে ব্যথা বা মাথা ব্যথা, যা চিকিৎসা করলেও ঠিকঠাক
    সারে না

এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে অনেকসময়ে এরকম আচরণ বেশ কিছু ঘন্টা বা দিন ধরে চলতে থাকে। যদি কোনও অভিভাবক ২ থেকে ৩ সপ্তাহ ধরে একনাগাড়ে তার বাচ্চার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখতে পায় তাহলে বুঝতে হবে বাচ্চা মানসিক  অবসাদে আক্রান্ত হয়েছে। সমস্যাটা ঠিকঠাক বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

বয়ঃসন্ধিদের অবসাদ চিহ্নিত করার উপায়

আট বছরের বেশি বয়সের বাচ্চা এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অবসাদের যে লক্ষণ দেখা যায় তার সঙ্গে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের অবসাদের মিল রয়েছে। সেগুলো হল-

  • ঘুম এবং খিদে বোধের পরিবর্তন
  • বিষণ্ণ মনোভাব
  • হামেশাই মেজাজ-মর্জির বদল
  • আনন্দের কাজগুলোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
  • খুব সহজেই কান্ত বোধ বা অধিকাংশ সময়ে আলস্য বোধ করা
  • মারমুখী আচরণ
  • সবসময়ে নিজের মৃত্যুর কথা ভাবা (যদি আমি মরে যেতাম, জীবনটা যেন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে)
  • আত্মহত্যার কথা বলা বা আত্মহত্যার চেষ্টা করা

অবসাদগ্রস্ত এবং উদ্বেগরত বাচ্চারা স্কুলে যেতে চায় না; কোনওরকম অসুখ না হলেও তারা সারাদিন বাড়িতেই থাকতে চায়। এইসময়ে তারা এমন কাজ যাতে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয় না, যেমন টিভি দেখতে বা গান শুনতে পছন্দ করে। তারা ক্রমশ অনিয়মিত রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পড়াশোনা এড়িয়ে চলে। এর প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলের উপর পড়ে। আর এজন্য তাদের  মানসিক উদ্বেগ আরও বেড়ে চলে। এইসময়ে বাচ্চাদের মনে হয় যে তারা একটা বদ্ধ জীবনে জড়িয়ে পড়েছে।

বয়ঃসন্ধির সময়ে এই আচরণ বেশ কিছু ঘন্টা বা দিন ধরে চলতে থাকে। এই সমস্যা ২-৩ সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

একদম বাচ্চা বয়সে যাদের মধ্যে বিকাশজনিত সমস্যা অর্থাৎ কথা বলতে দেরি হওয়া, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, বৌদ্ধিক অক্ষমতা বা অটিজম থাকে তাদের ক্ষেত্রে অবসাদ এবং উদ্বেগের লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে। তখন সঠিক রোগ নির্ণয় বা চিহ্নিত করা খুবই অসুবিধাজনক হয়ে ওঠে। যদি অভিভাবকরা তাদের সন্তানের মধ্যে এসব অস্বাভাবিকতা দেখতে পায় তাহলে তাদের উচিত অবিলম্বে মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।

নীচের বিকাশজনিত অব্যবস্থাগুলো দেখা দিলে একজন অভিভাবক বুঝতে পারবে যে তার বাচ্চার মানসিক অবসাদ বা উদ্বেগের সমস্যা হয়েছে-

 স্বাভাবিক অবস্থা               

যখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন

দু-বছর বয়সে বাচ্চার খুব রেগে যাওয়া (বিকাশগতভাবে সঠিক)

আট বছর বয়সে হামেশা রাগারাগি করা (বিকাশগতভাবে সঠিক নয়)

বাচ্চার মধ্যে আনন্দ ও দুঃখের সহাবস্থান; কোনও বিশেষ ক্ষেত্রে ভয়, কিন্তু তাতে তাদের কাজকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না

ভয়ের প্রভাব-

১। শিশুর নিজস্ব কাজকর্মে বাধা। বাচ্চারা খেতে, ঘুমাতে বা নিজেদের যত্নের ক্ষেত্রে অনিয়ম করে।

২। বাচ্চারা সমাজে মেলামেশা করতে চায় না। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায় না বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চায় না। পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়।

অস্বাভাবিক আচরণ কয়েক  ঘন্টা বা দিন অথবা ২-৩ সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে।

 

উদ্বেগ ও অবসাদের চিকিৎসা

অবসাদ একটা বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেই সঙ্গে তার লেখাপড়া ও দৈনন্দিন কাজকর্মেও ব্যাঘাত ঘটে। যদি কোনও অভিভাবক তার সন্তানের আচরণে উপরে বর্ণিত লক্ষণগুলো দেখতে পায় তাহলে তার উচিত একজন শিশু চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা।

বাচ্চাদের যদি অল্প বা মাঝারি ধরনের অবসাদ এবং উদ্বেগের সমস্যা হয় তাহলে তা থেরাপি অথবা অন্য চিকিৎসায় সেরে যায়। থেরাপির মধ্যে আর্ট অ্যান্ড প্লে থেরাপি খুবই কার্যকরী। একটু বড় বয়সের বাচ্চা এবং বড়দের ক্ষেত্রে কগনিটিভ বিহেভায়র থেরাপি (সিবিটি) বা সমগোত্রীয় অন্যান্য থেরাপি অত্যন্ত উপকারী।

শিশু ও বয়ঃসন্ধিদের মাঝারি অবসাদ ও উদ্বেগের জন্য প্রাথমিকভাবে থেরাপিই ভালো ফল দেয়।

বাচ্চাদের গুরুতর অবসাদ বা উদ্বেগের ক্ষেত্রে থেরাপির সঙ্গে প্রয়োজন হয় ওষুধের। সাধারণত বড়দের তুলনায় বাচ্চা বা বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েদের কম মাত্রার ওষুধ  দেওয়া হয়। যদি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কোনও শিশুকে ওষুধ খেতে দেয় তাহলে অভিভাবকদের কাছে তার পরামর্শ থাকে যে মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে এসে বাচ্চাকে দেখাতে হবে ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নজর রাখতে হবে।

যদি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দেওয়া ওষুধ নিয়ে কোনওরকম চিন্তা থাকে তাহলে তা অবিলম্বে সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে আলোচনা করে অন্য ওষুধ দেওয়ার কথা ভাবতে হবে।

বাচ্চার উদ্বেগ বা অবসাদের সমস্যায় অভিভাবকরা কীভাবে যত্ন নেবেন

অভিভাবক হিসেবে একটা শিশুর অবসাদ বা উদ্বেগের সমস্যা বুঝতে কারোর অসুবিধা হতেই পারে। বাচ্চার অসুস্থতার জন্য অভিভাবকরা খুবই চিন্তায় পড়তে পারেন ও নিজেদের দোষী বলেও ভাবতে পারেন। পরিচর্যাকারী হিসেবে একজন তখনই তার সন্তানের ভালো করে দেখভাল করতে পারবে যখন সে অসুখ সম্পর্কে ঠিকঠাক ধারণা করবে। এজন্য অসুখ সম্বন্ধে অভিভাবকদের মনের সব সন্দেহ দূর করার জন্য চাই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলা। সেই সঙ্গে বাচ্চা যাতে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয় সেজন্য অবিলম্বে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে।

বাচ্চাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় কাটানো এক্ষেত্রে একান্ত জরুরি। অভিভাবকদের ক্ষেত্রে বাচ্চাদের লক্ষণগুলোকে ছোট করে দেখা উচিত নয়, তাদের আচরণের সমালোচনা ও অন্যদের আচরণের সঙ্গে তুলনা করা একেবারেই অনুচিত। সমস্যাগুলো নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে ও ধৈর্য ধরে শুনতে হবে।

বাচ্চাদের মধ্যে যদি অবসাদ বা উদ্বেগের সমস্যা খুব গভীর হয়ে দেখা দেয় তখন তাদের মাথায় আত্মহত্যার চিন্তাও আসতে পারে। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে ও তাঁর কথা মতো বাচ্চার নিরাপত্তার দিকটি সুনিশ্চিত করতে হবে। যদি অভিভাবকরা দিশাহারা বোধ করেন তাহলে কাউন্সেলরের সাহায্য অবশ্যই দরকার।

বয়ঃসন্ধিদের জন্য অবসাদ ও উদ্বেগ মানিয়ে নেওয়ার কয়েকটি পন্থা

যদি দেখা যায় যে উদ্বেগ বা অবসাদের কারণে ক্লান্ত বা দিশাহারা বোধ হচ্ছে তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কারণে বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিপর্যয়মূলক চিন্তাভাবনা আসতে পারে ও তারা দিশাহারা এবং মনমরা হয়ে থাকতে পারে।

যদি এরকম লক্ষণ দেখা যায় তাহলে তখনই একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি। বিশ্বাসভাজন কোনও বয়স্ক মানুষকে নিজের সমস্যার কথা জানানো দরকার। একবার মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে পরিকল্পনামাফিক চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হয়।

যদি মনে বিপর্যয়মূলক চিন্তাভাবনা হয় তাহলে মনকে তা থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করতে হবে। সেজন্য আঁকা, খেলাধূলা, গান শোনা, বই পড়ার সঙ্গে ঠিকঠাক ওষুধ খাওয়া ও যোগচর্চা করা খুবই উপকারী। এ বিষয়ে কোন কৌশল অবলম্বন করলে  তা যথাযথ হবে, তা নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এই অবস্থায় একজন কাছের মানুষের সাহায্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়। তাদের কাছে নিজের অনুভূতির কথা বলতে হবে ও সঠিক সাহায্য চাইতে হবে।

 

শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যার মধ্যে উদ্বেগ এবং অবসাদ সর্বোপরি

স্কুলে বরাবর খুব ভাল ফল করা আর্শিয়ার মধ্যে সবসময়ে ক্লাসে প্রথম হওয়ার চাপ থাকত। স্কুলের শেষ বছরে সে ক্রমশ পড়াশোনা নিয়ে অধীর হয়ে উঠছিল। তার সবসময়ে মনে হচ্ছিল যে সে কি বোর্ডের পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারবে? নিজের পছন্দমতো কলেজে কি ভর্তি হতে পারবে? তার চিন্তা হচ্ছিল যে যদি কোনও কারণে সে পরীক্ষায় খারাপ ফল করে তাহলে কী হবে?

এসব কারণে আর্শিয়া খুব মনমরা হয়ে থাকত এবং মাঝে মাঝে তার মাথায় আত্মহত্যা করার চিন্তা আসত। কিছুতেই সে তার লেখাপড়ার দিকে মন দিতে পারত না। সবসময়ে অত্যন্ত ক্লান্ত বোধ করত ও মাথায় ব্যথা অনুভব করত।

যখন আর্শিয়ার বাবা-মা এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করতে শুরু করলেন তখন একজন কাউন্সেলর তাদের বোঝাতে সাহায্য করলেন যে আর্শিয়ার নিজের স্বত্তার মধ্যে পড়াশোনায় অসাধারণ হওয়ার চিন্তা একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছে। বোর্ডের পরীক্ষায় সবচেয়ে সেরা হওয়ার নেশা তাকে পেয়ে বসেছে। যদি সে কোনও কারণে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারে তাহলে কী হতে পারে, সেই বাস্তবটা দেখার কোন চেষ্টাই করছিল না আর্শিয়া। এই কারণে কয়েক মাসের জন্য আর্শিয়ার মনে উদ্বেগ ও অবসাদের জন্ম হয়েছিল।

সাধারণ মানুষের মনে একটা ভুল ধারণা রয়েছে যে অল্পবয়সি ছেলে-মেয়ে এবং বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েরা নিজেদের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। আর তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, যেমন- অবসাদ ও উদ্বেগের জন্ম হতেও  পারে না।

বাস্তব চিত্র: সাত বছরের নীচে থাকা শিশুদের মধ্যে অন্ততপক্ষে চার শতাংশের ক্ষেত্রে শৈশবকালীন মানসিক অবসাদ বা উৎকণ্ঠার জন্ম হয়।

আট বছর বা তার বেশি বয়সের বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশের ক্ষেত্রে অবসাদজনিত সমস্যা দেখা দেয়। পূর্ণবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের মধ্যেও প্রায় এই হারেই এমন মানসিক অসুখ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই ধরনের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা না হলে তা ক্রমে লাগাতার মানসিক অসুখে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। শৈশবে হওয়া অসুখ বয়ঃসন্ধি বা বড়  বয়সেও তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা একজন বাচ্চাকে তার সমস্যা কাটিয়ে সুস্থ হতে সাহায্য করে।

একজন শিশু যখন আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে তখন তার মধ্যে দুঃখ, মনমরা ভাব এবং নানারকম আবেগ দেখা দিতে পারে। কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে এই ধরনের বোধগুলো অনেক সময় ধরে স্থায়ী হয় এবং তাদের অনুভূতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর তার প্রভাব পড়ে।

শিশু এবং বয়ঃসন্ধিদের মধ্যে মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগ খুবই বাস্তব একটা সমস্যা। সেই সঙ্গে প্রায়শই এই সমস্যা দুটোর সহাবস্থান ঘটে। একজন বাচ্চার চিন্তা, বোধ, আচরণ তথা তার সমগ্র জীবনযাপনের মধ্যে অবসাদ ও উদ্বেগজনিত সমস্যার প্রভাব পড়তে দেখা যায়।







Was this helpful for you?