We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা

ইন্টেলেকচুয়াল ডিসেবিলিটি বা বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা কি?

৪ বছরের অনিরুদ্ধ একা একা হাঁটতে পারেনা। নিজের বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের লোকজনদের চিনতে পারলেও নিজের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চিনতে এবং অর্থবহ কথা বলতে পারেনা। পরীক্ষা করলে পরে জানা যায় যে সে বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত যার মস্তিষ্ক একটি ১ বছরের শিশুর সমান বুদ্ধির অধিকারী।

এই রোগের সম্পর্কে বোঝানোর জন্যে বাস্তব পরিস্থিতি অবলম্বনে উপরোক্ত কাল্পনিক কাহিনীটি তৈরি করা হয়েছে।

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা - যাকে অনেক সময়ই লোকে পাগলামি বলে থাকেন - মানে যেখানে ব্যক্তির মানসিক বৃদ্ধির গতি খুব ধীর হয়। বিশেষত মোটর স্কিল (অঙ্গ সঞ্চালনা), কগ্নিটিভ এবিলিটি (পরিস্থিতি অনুযায়ী চিন্তা করার ক্ষমতা), সোশ্যাল স্কিল (লোকজনের সাথে মেলামেশা করার ক্ষমতা) এবং ল্যাঙ্গুয়েজ ফাংশন (কথা বুঝতে বা বলতে পারা) নিয়ে সমস্যা প্রবল ভাবে দেখা যায়। এই রোগকে মূলত মানসিক অক্ষমতা বলেই দেখা হয়। 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:  পাগল কথাটা আমাদের দেশে বহু ব্যবহৃত হলেও শব্দটি অপমানজনক। তাই আমরা এখানে ইন্টেলেকচুয়াল ডিসেবিলিটি বাবুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা কথাটি ব্যবহার করব। বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা, যাকে মেন্টাল রিটার্ডেশনও বলা হয়, কোনও মানসিক রোগ নয়।

জন্মের পর আমাদের সবারই প্রায় ১৮ বছর বয়স অব্ধি মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে। এবং মানসিক বৃদ্ধি ঘটে এক নির্দিষ্ট নিয়মানুসারে। যেমন ১৫ মাস বয়সের মধ্যেই শিশু অল্প কিছু শব্দ বলা শিখে ফেলে। তা না হলে বুঝতে হবে যে শিশুর মানসিক বৃদ্ধিতে ঘাটতি রয়ে গেছে অথবা তাঁর আই কিউ ৮৫-রও কম। সেই ক্ষেত্রে আমরা ধরে নেব যে শিশু বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার শিকার।

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার উপসর্গগুলি কি?

এই রোগের কয়েকটি উপসর্গ জন্মের পরেই দেখতে পাওয়া যায়। প্রিম্যাচিওর ডেলিভারির ক্ষেত্রে যেইসব শিশুদের ওজন কম থাকে বা জন্মের সময় যেই সমস্ত শিশু শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যাতে ভোগে তাঁদের বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। ৬-১২ মাস বয়সের মধ্যে উপসর্গ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার, অনেক সময় ২ বছর বয়সের আগে কিছু নাও বোঝা যেতে পারে। অধিকাংশ শিশুরই জন্ম থেকেই এই রোগ থাকে। কিন্তু মস্তিষ্কে কোনও আঘাত লাগলে তা পরেও হতে পারে। 

সেই ক্ষেত্রে শিশুরা হাঁটা শিখতে, হামাগুড়ি দিতে বা কথা বলা শিখতে অনেক বেশী সময় নেয়। এই রোগের খুব সাধারণ উপসর্গগুলি নিচে দেওয়া হল।

  • সময়ের সাথে সাথে মানসিক পরিবর্তন না আসা
  • ভাষা শিখতে দেরি হওয়া
  • দুর্বল স্মৃতিশক্তি
  • সামাজিক নিয়মকানুন মনে রাখতে অসুবিধা
  • হিসেব রাখতে না পারা

নিজের যত্ন নেওয়া শিখতেও সময় নেওয়া
 

আপনি কখন সতর্ক হবেন

  • নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যদি শিশুর জন্ম হয় এবং তাঁর ওজন ২ কেজির কম থাকে।
  • বারংবার খিঁচ ধরা
  • শিশু যদি অতিমাত্রায় অলস হয়
  • ৪-৫ বছর বয়সেও যদি সে নিজে চান করতে, খেতে বা শৌচালয় যেতে না পারে।

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে অন্যান্য সমস্যা

আচরণগত সমস্যা: সাধারণত এঁরা অস্থির এবং খিটখিটে মেজাজের অধিকারী হন। যার ফলে এঁদের মধ্যে হিংস্র মনোভাব বা নিজের ক্ষতি করার মত মানসিকতাও লক্ষ করা যায়। সেই ক্ষেত্রে এঁদের সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং সেই উদ্দেশ্যে সব সময় একজন অভিজ্ঞ মনোবিদ্যার পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

খিঁচ ধরা: বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার রোগীদের ক্ষেত্রে খিঁচ ধরা খুবই স্বাভাবিক। গোটা শরীর জুড়ে, কিংবা বিশেষ কোন অংশে খিঁচ ধরতে পারে। অনেক সময় সামান্য ঝাঁকুনিতেই রোগী ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। এই সমস্ত কিছুই খুব সহজে ওষুধের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

দুর্বল দৃষ্টিশক্তি এবং শ্রবণ ক্ষমতা: বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার রোগীদের অন্তত ১০% ঠিকমত শুনতে বা দেখতে পান না। হিয়ারিং এইড, চশমা এবং কারেক্টিভ আই সার্জারির সাহায্যে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এছাড়াও কথা বলতে অসুবিধা, সেরিব্রাল পলসি এবং অটিজমের মত সমস্যা থাকতে পারে।

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা কেন হয়?

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা অনেক কারণে হতে পারে।

জন্মের আগে যেই সব কারণ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়

  • ডাউন সিন্ড্রোম, ফ্র্যাজাইল এক্স সিন্ড্রোম, প্রাডার উইলি সিন্ড্রোম, রুবিস্টেইন টাবি সিন্ড্রোম, ডি ল্যাঞ্জ সিন্ড্রোম বা ক্লাইনফেল্টার সিন্ড্রোমের মত জিনগত ক্রোমোজোমের সমস্যা
  • সিঙ্গল জিন ডিস্‌অর্ডার
  • পরিবেশগত কারণ
  • খাদ্যে আয়োডিন ও ফলিক অ্যাসিডের অভাব
  • গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি
  • গর্ভাবস্থায় মদ, নিকোটিন ও কোকেন সেবন
  • গর্ভাবস্থায় বিষাক্ত রাসায়নিক, ভারি ধাতু বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
  • রুবেলা, সিফিলিস বা এইচ আই ভি-র মত সমস্যা থাকলে

জন্মের সময় যেই সমস্ত কারণে এই রোগ হতে পারে

  • প্ল্যাসেন্টাল ডিস্‌ফাংশন
  • মায়ের হৃদপিণ্ড বা কিডনিতে সমস্যা
  • নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্ম
  • জন্মের সময় শিশুর ওজন ২ কেজিরও কম
  • জন্মের সময় শ্বাসকষ্ট

প্রথম ৪ সপ্তাহে

  • জন্ডিস
  • হাইপোগ্লাইসেমিয়া
  • সেপ্টিসেমিয়া

শৈশবে

  • টিবি বা মেনিনজাইটিসের মত অসুখ
  • অতিরিক্ত সীসার প্রভাবে
  • ক্রমাগত অপুষ্টি
  • মাথায় চোট

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার চিকিৎসা

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার সম্পূর্ণ নিরাময় অসম্ভব। কিন্তু পর্যাপ্ত সাহায্য ও যত্ন পেলে আপনার শিশুও তুলনামূলক স্বাধীন ও সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে। কারণ, মনোবিদরা প্রায়শই বলেন যে অযত্ন ও অবহেলার ফলেই বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার রোগীরা অস্বাভাবিক জীবন কাটান।

রোগীর যত্ন নিন

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এবং রোগীর যত্ন নেওয়াও রীতিমত কঠিন কাজ। কিন্তু, সুখবর হল যে প্রচুর সংগঠন ও সুযোগ সুবিধা আছে যার সাহায্য নিলে আপনি আপনার শিশুকে একটি সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারবেন। মনে রাখবেন, সুস্থ ও স্বাধীন জীবন আমাদের সবার অধিকার। আপনার সন্তান যাতে সমাজে মাথা উঁচু করে কোনও বিদ্বেষ ছাড়াই বাঁচতে পারে সেটা দেখা আপনার কর্তব্য।

রোগীর পরিবারকে অনেক সময় নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। লোকলজ্জা, নিজের যত্ন নেবার সময় না পাওয়া, আর্থিক কষ্ট এর মধ্যে প্রমুখ। শিশুকে স্বাভাবিক জীবন দিতে গেলে নিজের শ্রীর স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি নিম্নলিখিত পরামর্শগুলি খেয়াল রাখবেন

  • অভিজ্ঞ মনোবিদের থেকে সমস্ত তথ্য স্পষ্ট ভাবে বোঝার ও জানার চেষ্টা করুন।
  • অন্যান্য রোগীদের পরিবারের সাথে কথা বলুন।
  • আপনার শিশুর সমস্যাগুলি বোঝার চেষ্টা করুন।
  • বিশেষ পদ্ধতি ও কায়দায় শিশুকে শেখানোর নিয়ম জেনে নিন।
  • আপনার সন্তান আপনার লজ্জার কারণ নয়। লোকজনের উপহাসে কান দেবেন না।
  • শিখতে সময় নিলেও ধৈর্য সহকারে আপনার শিশুকে অনেক কিছুই শেখানো সম্ভব।
  • সন্তানকে বেশী আগলে রাখবেন না।
  • এই রোগের কোনও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা করাতে যাবেন না। কারণ সেরকম কিছু হয় না।

অনেকে দাবী করেন যে কিছু ওষুধ এবং গাছ-গাছড়ার সাহায্যে বুদ্ধি বাড়ানো সম্ভব। এই দাবীগুলো কিন্তু ভিত্তিহীন। এই রোগের কোনও চিকিৎসা নেই। তবে হ্যাঁ, মনোবিদের পরামর্শ নিলে রোগের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করলে রোগীকে লেখাপড়া বা বিভিন্ন কাজ শেখানোর রাস্তা পাওয়া সম্ভব।

সময়মত যত্ন

সময়মত, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, সেন্সরি মোটর সিমুলেশনের সাহায্য নিলে আপনার সন্তান অনেক তাড়াতাড়ি উন্নতি করবে। এই পদ্ধতি অনুসারে শিশুর বাবা-মা দৃষ্টি, শ্রবণ ও স্পর্শ ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শিশুকে বিভিন্ন ভাবে উৎসাহ দেন নতুন জিনিষ দেখতে, ধরতে এবং নাড়াচাড়া করতে।

শিক্ষা

সামান্য বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে আপনার শিশুর একটি স্বাভাবিক স্কুলে লেখাপড়া শেখা উচিৎ। কিন্তু রোগের গুরুতর পর্যায় বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্রর সাহায্য নিন। যেখানেই ভর্তি হোক, পড়াশুনোটা যেন ও শেখে সেইদিকে খেয়াল রাখবেন।

বিত্তিমুলক শিক্ষা

রোগীকে অযথা তাচ্ছিল্য করবেন না। সঠিক ভাবে শেখালে আপনার সন্তান অনেক কাজ শিখে অর্থ উপার্জন করতে পারে।

বুদ্ধিগত প্রতিবন্ধকতা এড়ানো যায় না?

নিম্নলিখিত পরামর্শগুলি মানলে রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

  • গর্ভাবস্থায় মাকে যথার্থ পুষ্টি দেওয়া যাতে শিশু স্বাভাবিক ওজন নিয়ে জন্মায়
  • আয়োডিন যুক্ত নুন খাওয়া
  • নিউরাল টিউব ডিফেক্ট এড়াতে ফলিক অ্যাসিড ও ট্যাবলেট সম্পর্কে সতর্ক থাকা
  • আয়রন ও ক্যালরি যুক্ত খাদ্য গ্রহণ
  • সময়মত টীকা করনের সাহায্যে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবার মত অসুখ এড়ানো যায়
  • ২১ বছর বয়সের আগে বা ৩৫ বছর বয়সের পরে গর্ভবতী হওয়া এড়িয়ে চলা। এর ফলে শিশুর জন্মের সময় হওয়া সমস্যা এবং ক্রোমোজোম গত রোগ এড়ানো সম্ভব
  • একটি শিশুর জন্মের পর পরবর্তী গর্ভাবস্থার আগে মা কে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিৎ
  • গর্ভাবস্থায় মদ, নিকোটিন বা কোকেনের মত ক্ষতিকর দ্রব্য এড়িয়ে চলুন
  • সিফিলিসের মত সংক্রমণ এড়াতে নিয়মিত পরীক্ষা এবং যত্নের প্রয়োজন
  • মায়ের আরএইচ নেগেটিভ রক্ত থাকলে আরএইচ আইএসও টীকা করণ এড়িয়ে চলা বাঞ্ছনীয়। প্রথম গর্ভাবস্থায় অ্যান্টি ডি ইমিউনোগ্লোবিন সম্বন্ধে সতর্কতা অবলম্বন করলে গর্ভজাত ভ্রূণের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব
  • শৈশবে ডাইরিয়া এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণের সঠিক চিকিৎসা করানো উচিৎ

মানসিক প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠনের জন্য রচিত একটি লেখা থেকে এই অংশটি নেওয়া হয়েছে। মূল রচনাটি ডাঃ সতীশ গিরিমাঝি (নিমহ্যান্স, ব্যাঙ্গালোর), ডাঃ সুলতানা এস জামান (বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন), পি এম ওয়াজেতুঙ্গা (সুসিতা স্বাসেথা পেরেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সর্বোদয়া, শ্রীলঙ্কা), এবং ডাঃ উদম পেজারাসঙ্ঘর্ণ (রাজানুকাল হাসপাতাল, ব্যাঙ্কক) দ্বারা রচিত।