মহিলা

মহিলাদের মধ্যে থাকা 'দৈহিক সৌন্দর্যগত অসন্তুষ্টি' মোকাবিলার কৌশল

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

একজন মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ বলতে বোঝায় নিজের সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি। আর তা ইতিবাচক বা নেতিবাচক- দুই হতে পারে। আমাদের  নিজেদের সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা শুধুমাত্র আমাদের আচার-ব্যবহার অর্থাৎ আমরা 'ভালো মানুষ' না 'মন্দ মানুষ'- তা দিয়ে বিচার করার মধ্যেই থেমে থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আমাদের ব্যক্তিত্বের আরও একটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্র, যেমন- আমরা কীভাবে আমাদের দৈহিক আঙ্গিক বা গঠনকে দেখছি বা আমরা কতখানি দৈহিক  সৌন্দর্যের অধিকারী অথবা আমরা আদৌ সুন্দর কিনা- এসব ভাবনা চিন্তাও আমরা করে থাকি। একেই বলা হয় দৈহিক ভাবমূর্তি। প্রকৃতপক্ষে, একজন মানুষের আত্মমর্যাদাবোধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার নিজের বাহ্যিক বা দৈহিক আকার-আয়তনের বিষয়টি। আর এটি মানুষের বিভিন্ন বয়সে জন্ম নেওয়া  আত্মমর্যাদাবোধের ক্ষেত্রে গুরুতর মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।  

গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে যে দৈহিক ভাবমূর্তি বিচারের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে মহিলাদের আত্মমর্যাদাবোধ অনেক কম। কারণ সমাজে পুরুষরা যেখানে তাদের আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলে নিজেদের কাজের সাফল্য, কর্মক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ শক্তির মাধ্যমে, সেখানে মহিলারা অন্যের চোখে বা নিজেদের চোখে নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্যের মূল্যায়নকেই বেশি গুরুত্ব দেয় ও বিশ্বাস করে। আত্মমর্যাদাবোধ ও দৈহিক ভাবমূর্তির মধ্যে থাকা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সমাজে তখনই সমস্যার সৃষ্টি করে  যখন তাতে মিডিয়া বা গণমাধ্যমের প্রভাব পড়ে। যেমন- টেলিভিশন, সিনেমা, বিজ্ঞাপন এবং গানের ভিডিওতে মহিলাদের প্রতিভা যতখানি না প্রকাশ পায় তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব পায় তাদের দৈহিক সৌন্দর্যের বিষয়টি। এই ধরনের একটা সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা ভুল হলেও, এখন সমাজে তা খুবই শক্তিশালী হয়ে  দেখা দিয়েছে। এখানে মহিলাদের বাহ্যিক সৌন্দর্যের দিকটি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে  উঠছে। ভারতের অল্পবয়সি মেয়েদের মধ্যে হওয়া এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ বয়ঃসন্ধির মেয়েরা নিজেদের দৈহিক আকার, আয়তন নিয়ে যথেষ্ঠ নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। এবং তাদের মধ্যে ৪৪ শতাংশের কাছে জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে হল নিজেদের দৈহিক সৌন্দর্যের বিষয়টি। দৈহিক ভাবমূর্তির কারণে মানুষের মধ্যে যে আত্মমর্যাদাবোধের অভাব দেখা দেয় তার ফলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন মানসিক সমস্যা যেমন- উদ্বেগ ও অবসাদের প্রবণতা জন্মায়। গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে যে যেসব মানুষ নিজের দৈহিক গঠন নিয়ে খুব বেশি মাত্রায় অসন্তুষ্ট থাকে তার মধ্যে অত্যধিক শরীরচর্চা এবং কম খাওয়ার প্রবণতা চূড়ান্ত ভাবে দেখা যায়, যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং ক্ষতিকারক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসজনিত অব্যবস্থা, যেমন- অ্যানোরেক্সিয়া, বুলিমিয়া প্রভৃতিও দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

দৈহিক অসন্তুষ্টির নানারকম খারাপ ফলাফল সত্ত্বেও একটা ভাল দিক হল যখন একজনের প্রকৃত দৈহিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে তখন সেই ঘটনা যথেষ্ঠ কঠিন এবং জটিল হলেও, সেই সময়ে তার দেহগত ভাবমূর্তির আমূল বদলও সম্ভব হয়। আমাদের মধ্যে নিজেদের দৈহিক গঠনের বদল ঘটানো, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, অনুভব করার একটা সহজাত শক্তি রয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকটি সুপরামর্শ হল-

  • নিজেদের ইতিবাচক গুণ, দক্ষতা এবং প্রতিভার বিকাশ ঘটানো জরুরি।  এগুলোর সাহায্যে নিজেদের নিজস্বতাকে গ্রহণ করা এবং মেনে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মায়। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে একজন মানুষকে যে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়, সে সম্পর্কেও যথাযথ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
  • প্রতিদিন নিজের ভালো দিকগুলো নিয়ে চর্চা করা দরকার। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক কথাবার্তা এড়িয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী কথা বলা ও কাজ করা উচিত। নিজের দৃঢ়তা সম্পর্কে ইতিবাচক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে, যেমন- 'আজ আমি খুব ভালো কাজ করেছি' বা 'চলন্ত সিঁড়ির বদলে সাধারণ সিঁড়ি দিয়ে ওঠার জন্য আমি নিজেকে নিয়ে গর্বিত বোধ করছি'- এমন মনোভাব পোষণ করা জরুরি। নেতিবাচক চিন্তাভাবনাগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলো ইতিবাচকভাবে ভাবা প্রয়োজন। যেমন- 'কীভাবে আমি সবসময়ে মুখোরোচক খাওয়াদাওয়াকে ঘেন্না করতে পারি' বলার পরিবর্তে ইতিবাচকভাবে বলা উচিত 'আমি জানি স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া করাই ভালো'।
  • সচেতনভাবে দেহ সঞ্চালন করা জরুরি। আমাদের শরীর একপ্রকার অভাবনীয় বস্তু। তাকে সম্মান দিতে হবে, গুরুত্ব দিতে হবে। এর ফলে একজনের মধ্যে ইতিবাচক  মনোভাবের বিকাশ ঘটবে। নিজের শরীরচর্চা বা খেলাধূলার দক্ষতাকে স্বীকৃতি জানানো দরকার। অথবা চিন্তা করতে হবে যে একটা মেয়ের বাহ্যিক গঠন ছোটবেলা থেকে কত সুন্দরভাবে বিকশিত
    হয়ে ওঠে।
  • শারীরিক ওজন কমানো সংক্রান্ত চিন্তাভাবনার বদলে ইতিবাচক,  সুস্বাস্থ্যজনিত লক্ষ্য স্থির করতে হবে। এমনভাবে খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরচর্চার অনুশীলন করতে হবে যা দৈহিক ওজন কমাতে সাহায্য করবে। আর সেই সঙ্গে সর্বাঙ্গীন সুস্থতাও বজায় রাখবে।
  • অন্যের সঙ্গে নিজের দৈহিক গঠনের তুলনা করা কখনোই ঠিক নয়। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে প্রত্যেক মানুষের আলাদা-আলাদা অর্থাৎ অনন্য বৈশিষ্ট্য  থাকে। আর এর সাহায্যেই মানুষের বিশেষত্ব গড়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে একজন মানুষ যখন তার সমগ্র সত্ত্বাকে খোলা মনে গ্রহণ করে নেয় তখনই তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদাবোধের ইতিবাচক বিকাশ ঘটে।
  • চারদিক দেখেশুনে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকে নিতে হবে। কারণ আমরা অনেকসময়েই পারিপার্শ্বিকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যাই। বিশেষ করে 'সুন্দর' বা 'গ্রহণযোগ্যতা'র বোধ জাগাতে মিডিয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তবে এবিষয়ে মনে রাখা জরুরি যে মিডিয়ায় যেসব ছবি বা ভাবনা ফুটে ওঠে তা সবসময়ে বাস্তবসম্মত হয় না এবং তাতে খুব কম সংখ্যক জনগণ অংশ নেয়। এমন অনেক ম্যাগাজিন রয়েছে যা মানুষের মনে আপাতভাবে ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দেয়। বাস্তবের চিন্তাভাবনার প্রকাশ সেখানে বেশি দেখা যায় না।

যদি আপনি বা আপনার কাছের মানুষ নিজের দৈহিক সৌন্দর্য নিয়ে অসন্তুষ্টিতে ভোগেন বা অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া অথবা শরীরচর্চায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তাহলে  অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এমন কাউন্সেলর বা মনোবিদরা রয়েছেন যাঁদের এই বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান রয়েছে। একজন পেশাদারের সাহায্যে নেতিবাচক বিশ্বাস এবং আচরণের বদল ঘটানো সম্ভব।

প্রবন্ধটি লিখেছেন দিল্লির একজন নামী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডাঃ গরিমা শ্রীবাস্তব। ইনি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সাইন্সেস থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।       

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org