এমন মন্তব্য বারবার শুনে নিজের শরীরকে ভালবাসতে পারছিলাম না
মহিলা

এমন মন্তব্য বারবার শুনে নিজের শরীরকে ভালবাসতে পারছিলাম না

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

ছোটবেলা থেকেই আমি খুব খুঁটে খুঁটে খাওয়াদাওয়া করতাম। সম্ভবত আমার যখন আট বছর বয়স তখন থেকেই আমি ভালোভাবে খেতে শুরু করেছিলাম। ক্রমশ যত বড় হতে লাগলাম, সম্ভবত ১০ বছর বয়স থেকেই আমার দৈহিক ওজন বাড়তে আরম্ভ করেছিল। আর তখন থেকেই আমার চারপাশের মানুষের চোখে তা ধরা পড়তে শুরু করেছিল।

সেই সময়ে আমি মডেল হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। সেই সঙ্গে ছিল মিস ইউনিভার্স  খেতাব জয় করার ইচ্ছে। কিন্তু সেজন্য সবাই আমায় ছিপছিপে এবং নিজেকে সুন্দর করে তোলার কথা প্রায়ই বলত। ফলে নিজের সৌন্দর্যকে প্রথাগত মানদণ্ডে বিচার করার উপলব্ধি আমার তখনও জাগেনি।

যদি আমি ছোটবেলায় ভাবতাম যে আমি খুব একটা খারাপ দেখতে নই, তবু আমার পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুবান্ধবরা আমার দৈহিক ওজন নিয়ে এমনসব মন্তব্য করত যা শুনতে আমার খুবই বাজে লাগত। আমার মনে আছে তাদের কথাবার্তাগুলোকে আমি অত্যন্ত সচেতনভাবে গ্রহণ করতাম। এভাবে আমার মধ্যে নিজের দৈহিক গঠন নিয়ে একপ্রকার অপছন্দের বোধ জেগে উঠেছিল।

যখন আমার বারো বছর বয়স তখন বাবা-মা আমার জন্য যোগব্যায়াম এবং ডায়েটিং-এর ব্যবস্থা করে। আমিও তাতে যোগ দিই। এর মাস তিনেকের মধ্যেই আমার ওজন ১২-১৩ কিলো কমে গিয়েছিল এবং ভীষণভাবে আমার মাথার চুলও সেই সময়ে উঠতে শুরু করেছিল। গোটা স্কুল জীবন ধরে আমার বন্ধুরা আমায় মুটি বলে ডাকত এবং এই নামটা শুনতেই আমি একেবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। যদিও যোগাব্যায়াম আর ডায়েটিং করে আমার ওজন আগের থেকে অনেক কমে গিয়েছিল এবং আমায় বেশ রোগাও দেখাত, তবুও তা নিয়ে আমি মোটেই খুশি  হতাম না। আমি তখনও নিজের দৈহিক গঠন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারতাম না। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটলে আমার বন্ধুরা আমায় নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত। তাই সেই বিষয়েও আমি অতিরিক্ত সজাগ হয়ে গিয়েছিলাম।

এরপর স্কুল ছেড়ে যখন আমি কলেজে ভর্তি হই তখন আবার একটু একটু করে আমার ওজন বাড়তে শুরু করেছিল। এইভাবে অনবরত ওজন বাড়া-কমা এবং নিজের দৈহিক গঠন নিয়ে অপছন্দের মনোভাব জন্মানোর ফলে আমার মধ্যে মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগের সমস্যা দেখা দেয়। পরে আমি জেনেছিলাম যে আমি পিসিওডি (PCOD)-র সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। আর এজন্যই আমার মধ্যে অবসাদ ও উদ্বেগের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল।

আমার মা খুব নিখুঁত ধরনের একজন মানুষ। মূলত মায়ের এই মানসিকতার জন্যই আমার মধ্যে ওজন কমানোর তাগিদ দেখা গিয়েছিল। তা নাহলে আমি এ ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী হতাম না। আমি মনে করতাম যে আমি মোটেই সুন্দর দেখতে নই। আর এজন্য প্রায়ই আমার মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হত বা আমি হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। দৈহিক বা শারীরিক বিকাশ যে একটা প্রক্রিয়া এবং সেটা যে শুধুই ঊর্ধ্বমুখী হয় না- সে কথাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এই কারণে আমি গুরুতর মানসিক উদ্বেগের শিকার হয়েছিলাম। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত এই সমস্যার জন্য আমি একজন কাউন্সেলরের পরামর্শও নিয়েছিলাম। আমার মনে আছে ডাক্তার আমায় খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে মানসিক চাপ কমাতে বলেছিলেন এবং তাঁর কথা মতো আমি তা করেও ছিলাম।

এই সমস্যা দূর করতে কে আমায় সাহায্য করেছিল এই প্রশ্নের উত্তরে বলব যে বিশেষজ্ঞের সহায়তা তো ছিলই। সেই সঙ্গে আমার প্রিয় বন্ধুর ক্ষেত্রেও দৈহিক ভাবমূর্তিজনিত সমস্যা ঘটতে আমি দেখেছিলাম। আমার ওই বন্ধুকে বাইরে থেকে খুবই চকচকে, ঝলমলে লাগত। কিন্তু তার মনে হত যে সে নাকি বেশ মোটাসোটা মানুষ। কীভাবে রোগা হওয়া যায় সে কথাই সে জীবনভর বলত। এই থেকেই আমার উপলব্ধি হয়েছে যে আমাদের চারপাশে থাকা মানুষজনের ভাবনাচিন্তা আমাদেরকে কোনও না কোনওভাবে প্রভাবিত করে এবং সেই কারণেই আমরা  নিজেদের বিষয়ে নানারকম ধারণা,আন্দাজ করে ফেলি। এই ধারণা ইতিবাচক বা নেতিবাচক- দুটোই হতে পারে। ইতিবাচক দৈহিক ভাবমূর্তির প্রভাব হিসেবে আমার মধ্যে এই উপলব্ধিই হয়েছে যে কোনও মানুষেরই তার শরীরের কোনও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিখুঁত করার জন্য পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করার প্রয়োজন নেই। সেই সঙ্গে জন্মগতভাবে যার যেমন দৈহিক ভাবমূর্তি, সেই ভাবমূর্তিকেই তার খোলা মনে গ্রহণ করা জরুরি।

যিনি তাঁর জীবনের এই অভিজ্ঞতার কথা হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনকে জানিয়েছেন, তাঁর পরিচয় সুরক্ষিত রাখার জন্য তাঁর নাম এই প্রবন্ধে গোপন রাখা হয়েছে।   

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org