সাইকোসোশ্যাল (মানসিক ও সামাজিক) ভাবে অক্ষম মানুষ – একটি ভারতীয় দৃষ্টিকোণ
আইন সংক্রান্ত

সাইকোসোশ্যাল (মানসিক ও সামাজিক) ভাবে অক্ষম মানুষ – একটি ভারতীয় দৃষ্টিকোণ

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচলিত ‘পার্সন্স উইথ ডিসএবিলিটিস’ (ব্যক্তি যাদের অক্ষমতা রয়েছে) কথাটিকে ভারতেও গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে এবিষয়ে প্রথম বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা চালু হয় এবং 'অক্ষম মানুষ'-এর ধারণা সম্পর্কিত একটি বৈজ্ঞানিক পরিভাষা গড়ে ওঠে। চিকিৎসাশাস্ত্রের নিয়মাবলীর উপর ভিত্তি করে 'অক্ষম মানুষ'-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। অক্ষমতার পরিসরটিকে সাতটা দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং যে কোনও মানুষের ক্ষেত্রে অক্ষমতাজনিত শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য ৪০ শতাংশের বেশি দুর্বলতার প্রমাণপত্র দাখিল করার নিয়ম বিধিবদ্ধ হয়েছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জ বা ইউনাইটেড নেশন কর্তৃক প্রস্তাবিত অক্ষম মানুষের অধিকারের (ইউএনসিআরপিডি) বিষয়টি ২০০৭ সালে ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন পেয়েছে। এবং সেই প্রস্তাব অনুযায়ী অক্ষম মানুষের অধিকার সংক্রান্ত আইন প্রনয়নের জন্য একটা খসড়া রচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রস্তাবিত সিআরপিডি সংক্রান্ত সংজ্ঞার ১নং অনুচ্ছেদে অক্ষম মানুষের সংজ্ঞাটি তুলে ধরা হয়েছে- ''অক্ষম ব্যক্তি বলতে সেই সব মানুষজনকে বোঝায় যাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দৈহিক, মানসিক, বৌদ্ধিক অথবা অনুভূতিগত দুর্বলতা থাকে। আর এই দুর্বলতার জন্যই তাদের সমাজের সঙ্গে সম্পূর্ণ ও কার্যকরী যোগাযোগ গড়ে তুলতে এমন কতগুলো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়, যা সমাজের অন্যান্য  মানুষজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।''

ভারতের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রচলিত আইন অক্ষমতাজনিত অধিকারের আইনের থেকেও পুরনো। সেই সঙ্গে ওই আইনের মধ্যে ঔপনিবেশিকতার প্রভাবও রয়েছে। মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রথমে ''পাগল'' বা ''উন্মাদ'' শব্দ বা পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আইনে, যা এখনও প্রচলিত রয়েছে, 'মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি'- এই পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। সেখানে বলা হয়েছে  ''এই অসুস্থ ব্যক্তি, যার মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকার চাইতে যে কোনও ধরনের মানসিক অব্যবস্থার জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।'' মানসিকভাবে অক্ষমদের অধিকার বিষয়ক বিলের সাম্প্রতিক খসড়ায় বলা হয়েছে যে ''মানসিক অসুস্থতা'' আসলে ''মানুষের চিন্তাশক্তি, মেজাজ, ধারণা, গতিপ্রকৃতি বা স্মৃতিশক্তির সমস্যা যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার বিচারশক্তি, আচরণ, বাস্তবকে বোঝার ক্ষমতা বা জীবনের স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়ার বিচার-বিবেচনা। কিন্তু মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ার সঙ্গে এগুলোর কোনও সম্পর্ক নেই। মানুষের মনের যথাযথ বিকাশ যখন অসম্পূর্ণ থাকে তখনই আসলে মানুষের পশ্চাদমুখিতা দেখা দেয়। এই অবস্থাকে সাধারণভাবে মানুষের বুদ্ধি-বিচক্ষণতার পরিপূর্ণতার অভাবের দ্বারা বিচার করা হয়।'' এছাড়া অন্যান্য দুর্বলতাগুলোকে যেমন- মানুষের শেখার ক্ষমতার সমস্যা, গতিময়তার অক্ষমতা প্রভৃতি বিভিন্নভাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

অতি সম্প্রতি এ বিষয়ে আদর্শ চিকিৎসা বিধি গড়ে উঠেছে। ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড হেলথ্‌ অরগ্যানাইজেশন কর্তৃক প্রকাশিত ''ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অফ ইমপেয়ারমেন্টস্‌, ডিসএবিলিটিস অ্যান্ড হ্যান্ডিক্যাপস্‌: আ ম্যানুয়াল অফ ক্লাসিফিকেশন রিলেটিং টু দ্য কনসিকুয়েন্সেস অফ ডিজিজ্‌''-এ অক্ষমতা বলতে বোঝানো হয়েছে ''বৈকল্যের কারণে মানুষের মধ্যে দেখা দেওয়া কোনওরকমের সীমাবদ্ধতা বা কার্যক্ষমতার হ্রাস, যার ফলে মানুষের জীবনে সময়ের সাধারণ মাপদন্ডের মধ্যে কার্যকলাপ পূর্ণ করা সম্ভব হয় না।'' অন্যান্য দুর্বলতার মতো মানসিক অক্ষমতাও আদর্শ চিকিৎসাবিধির অর্ন্তগত নানা নিয়মাবলীর থেকে আলাদা নয়। আর এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে সারা পৃথিবীতে 'মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আইন'-এর প্রচলন। কিন্তু অন্যান্য দুর্বলতাগুলোর ক্ষেত্রে এমন আইনের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আইনে মানুষের সুচিকিৎসার দিকেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও অনেকসময়েই জোর করেই মানুষকে এই চিকিৎসা করাতে রাজি করানো হয়। আদর্শ চিকিৎসাবিধির ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই একটা বড় সমস্যা। আর এজন্য চিকিৎসার পরিকাঠামো এবং মানুষের অসুখ দূর করার ক্ষেত্রে নানারকম জটিলতা গড়ে ওঠে। সেই সঙ্গে অন্যান্য সীমাবদ্ধতাগুলোকেও দূর করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যার ফলে সমাজ ও মানুষের সক্ষমতা, সচলতা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আশা করা যায়, মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা, তাদের পরিচর্যাকারীরা এবং  পরিবারের সদস্যরা একযোগে তাদের আচার-আচরণ, ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এই বিষয়টিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলবেন। সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি 'দিব্যং' নামক যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তাতে অক্ষমতার চিকিৎসা আর নিছক চিকিৎসার মধ্যে না থেকে দাতব্য চিকিৎসার পর্যায়ে পরিণত হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের আত্মপরিচয় গড়ে তোলার দিকে আরও বেশি করে মনোনিবেশ করা হয়েছে।

প্রবন্ধটি লিখেছেন চেন্নাইয়ের আইনজীবী অম্বা সালেলকার। অক্ষমতাজনিত আইন এবং নীতি বিষয়ে এই আইনজ্ঞের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।             

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org