বৃদ্ধ

বর্ণনাঃ যত দিন এগোতে থাকল, তিনি সাম্প্রতিক কথাবার্তা অবধি ভুলে গিয়ে বারংবার একই প্রশ্ন করতেন

কাউন্সেলিং-এর সাহায্যে তাঁর পরিবার এই সত্যটা মেনে নিয়ে তাঁর যত্ন নিতে শুরু করল।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

আনন্দ (নাম পরিবর্তিত), বয়স ৭১, ৬ জন সদস্যের এক যৌথ পরিবারে বাস করতেন। এক সময় একটি সরকারি সংস্থায় স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতেন এবং ১০ বছর আগে অবসর নিয়েছেন। স্বল্পভাষী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ আনন্দবাবু একটা ছকে বাঁধা জীবন যাপন করতেন।

অবসর নেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই আনন্দবাবুর পরিবার-পরিজন লক্ষ করেন যে, তিনি পরিচিত লোকেদের নাম মনে রাখতে পারছেন না। জিনিসপত্র রেখে ভুলে গিয়ে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজতেন। বাড়ির লোকরা অবশ্য বিষয়টি নিয়ে তখনও অতটা মাথা ঘামায়নি। কারণ আনন্দবাবু নিজের দৈনন্দিন কাজকর্ম দিব্যি সেরে ফেলতেন।

আস্তে আস্তে আননবাবু চেনা রাস্তাঘাটেও হারিয়ে যেতে শুরু করলেন। কোনও কিছুই মনে রাখতে পারতেন না। এমনকী কোনও কাজ শুরু করে সেটা শেষ করতেও ভুলে যেতেন। তাই নিয়ে কেউ কিছু বলতে গেলে খিঁচিয়ে উঠে বলতেন, আমাকে শেখাতে হবে না। এই সবের ফলে বাড়িতে অশান্তি লেগেই থাকত।

একদিন আনন্দবাবু বিকেলবেলা হাঁটতে বেরিয়ে আর বাড়ি ফিরলেন না। এমনকী ফোনেও তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না। বহু খোঁজাখুঁজির পর আনন্দবাবুকে বাড়ির কাছেই এক রাস্তার পাওয়া গেল। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল যে, তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। কিছুতেই বাড়ি ফেরার রাস্তা মনে না করতে পেরে ঘাবড়ে গিয়ে বুঝতে পারছিলেন না যে, কি করা যায়। এই পরিস্থিতিতে তাঁর বাড়ির লোকেরা তাঁকে এক বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়।

ডাক্তাররা  প্রথমেই তাঁর পরিবারের ইতিহাস থেকে জানতে পারেন যে, আনন্দবাবুর মায়েরও বৃদ্ধ বয়সে ঠিক একই সমস্যা হয়ে ছিল। হাসপাতালে আনন্দবাবুর সম্পূর্ণ কেস স্টাডি করার পর একটি এম আর আই স্ক্যান এবং বেশ কিছু নিউরোসাইকোলজিকাল পরীক্ষা করা হয়। রিপোর্ট হাতে পাবার পর ডাক্তাররা নিশ্চিত রূপে জানান যে, আনন্দবাবু অ্যালঝাইমার্‌স-এ ভুগছেন। তাঁর পরিবারের লোকে এই কথা জানতে পেরে খুবই ভেঙে পড়েন এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আনন্দবাবুর মেয়েরা জানতেন যে, তাঁদের ঠাকুমা বৃদ্ধ বয়সে কীরকম অবহেলিত ছিলে। ফলে তাঁরা বাবার খেয়াল রাখতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। 

মেয়েরা এই সমস্যা মেনে নিলেও, আনন্দবাবুর স্ত্রী সত্যটা কিছুতেই স্বীকার করে নিতে পারছিলেন না। ৬৮ বছর বয়সী আনন্দবাবুর স্ত্রী নিজে একজন অস্টিও-আর্থ্রাইটিস-এর রোগী। এই অবস্থায় বাকি জীবনটা তাঁর স্বামীর দায়িত্ব নিতে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না।

অবশেষে প্রচুর কাউন্সেলিং-এর পর তাঁর স্ত্রী রাজি হলেন। তিনি ও তাঁর মেয়েরা মিলে আওনন্দবাবুর জন্য একটা নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করে দিয়েছেন। নিজের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে আনন্দবাবু নতুন কিছু শখ পালনও শুরু করেছেন। পরিবারকে পাশে পাওয়ার কারণে আনন্দবাবু অ্যালঝাইমার্‌সকেও জয় করতে পেরেছেন।

প্রফুল্ল এস. নামে নিমহ্যান্সের একজন পি এইচ ডি ছাত্র আনন্দবাবুর পরিবারের অনুমতি নিয়ে তাঁর এই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। গোপনীয়তার স্বার্থে শুধু রোগীর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org