শূন্য বাসা: যখন আপনার সন্তান নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়
বৃদ্ধ

শূন্য বাসা: যখন আপনার সন্তান নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

যখন আমাদের সাবালক সন্তানরা বিভিন্ন কারণের জন্য নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায় তখন ঠিক কী ধরনের ঘটনা ঘটে? এই ঘটনাটা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? একাকিত্ব যাদের নিত্যসঙ্গী তারা কীভাবে বিষয়টার মোকাবিলা  করে? এই জটিল ঘটনাটা বোঝার জন্য আমরা কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছিলাম।

শূন্য বাসা বা খালি ঘরের সঙ্গে মানুষের গভীর দুঃখ বোধ এবং একাকিত্বের হাহাকার জড়িয়ে থাকে, যা একজন মানুষের জীবনে তার সাবালক সন্তান বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে অনুভূত হয়। সন্তানদের দূরে চলে যাওয়াটা এক-একজন মানুষের কাছে এক-একরকমভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে। কেউ কেউ আগে হারিয়ে ফেলার কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। আবার কারও মধ্যে হারানোর যন্ত্রণা তীব্র হয়ে ওঠে। সন্তানদের দূরে চলে যাওয়াটা শুধু একজন মানুষের মনের বিষণ্ণতাকেই জাগিয়ে তোলে না, সেই সঙ্গে পরিচর্যাকারী এবং অভিভাবকদের কাছে এই ঘটনা আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলার মতো একপ্রকার বোধের জন্ম দেয়।

নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে সন্তানদের অন্য কোথাও চলে যাওয়ার ঘটনা মানুষের মনে একটা স্থায়ী বদল আনে। নানাদিক থেকে এই ঘটনা একজন মানুষের জীবনে সাবালকত্ব প্রাপ্তির পরবর্তী একপ্রকার গুরুতর বিষয়। প্রায়শই এই ঘটনা একজন মানুষের জীবনে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তার মনে অবসাদ বা উদ্বেগের লক্ষণও ফুটে উঠতে পারে। একনাগাড়ে চলতে থাকা মানুষের মনের হতাশা এবং অক্ষমতার বোধ থেকে অনেক বড়সড় সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ওই সমস্যার সমাধানের জন্য থেরাপির প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিতে পারে।

শূন্য বাসার অভিজ্ঞতার প্রভাব আপনার ও আপনার সন্তানের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর কীভাবে পড়তে পারে?

এই ঘটনার ফলে মানুষের মনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রকাশ্যে আসতে পারে। যে সব বাবা-মায়ের ছেলে-মেয়েরা স্বাধীনভাবে জীবন শুরু করতে চলে তাদের পক্ষে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বাবা-মায়ের সঙ্গে ক্ষণে-ক্ষণে টেলিফোনে কথাবার্তা বলা সম্ভব নাও হতে পারে। এবং এই ঘটনা একজন অভিভাবকের কাছে সন্তানদের সঙ্গে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতির লক্ষণ হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর জন্য অভিভাবকরা নানারকম পদক্ষেপ নিতে পারে অথবা সন্তানরা তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ঠ সহযোগিতা করছে না বলেও অভিভাবকরা সন্তানদের সমালোচনা করতে পারে। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে পুনরায় টানাপোড়েন শুরু হয়। যদিও অনেকসময়ে অভিভাবক এবং সন্তানরা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার জন্য বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এর মধ্য দিয়ে তারা ভবিষ্যতে নিজেদের সম্পর্কের ভিত শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়।

সম্পর্কজনিত টানাপোড়েনের সময়ে জটিল পরিস্থিতিকে সহজ করার জন্য সন্তানরা কী করতে পারে?

যে কোনও জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য দরকার ধৈর্য রাখা এবং সহানুভূতিশীল হওয়া। সন্তানদের বুঝতে হবে যে তারা বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার পরে তাদের ভালোমন্দের খবরাখবর জানার জন্য বাবা-মায়েরা অধীর ও অস্থির হয়ে ওঠে। অভিভাবকরা এই সময়ে অত্যন্ত সামান্য কারণেই রেগে যায়। তারা অনবরত ছেলে-মেয়েদের কাছে ঘ্যানঘ্যান শুরু করে তাদের বাড়ি ফিরে আসার জন্য। অনেকসময়ে সন্তানদের সঙ্গে তারা কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কারণ তারা ভাবে যে সন্তানরা তাদের পিছন থেকে আঘাত করার জন্য বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সন্তানরা অত্যন্ত বিরক্ত ও অসহায় বোধ করে। এইসময়ে সন্তানদের পক্ষে সবচেয়ে ভালো হল অভিভাবকদের আচরণ তাদের উপর কীরূপ প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা। অভিভাবকদের বোঝানো উচিত যে তারা পরবর্তীকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে কখনোই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবে না, তাদের জন্য অনেক সময় নিজেদের কাছে রাখবে। অনেকসময়ে শুধুমাত্র সন্তানদের এই মৌখিক আশ্বাসে অভিভাবক এবং সন্তানদের  পারস্পরিক সম্পর্ক অবনতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়। সেই সঙ্গে যখন বাবা-মায়ের সঙ্গে ছেলে-মেয়ের দেখা হবে তখন একে অপরের সঙ্গে অনেকসময়ে কাটানো জরুরি। এটা দু'পক্ষের অভিজ্ঞতায় বদল ঘটাতে দিশা দেখায়।

দম্পতিদের মধ্যে এই শূন্য বাসাজনিত সমস্যার প্রভাব কীভাবে বিপদ ডেকে আনে?

একবার যদি সন্তানরা বাড়ি ছেড়ে চলে যায় তাহলে তাদের বাবা-মায়ের দাম্পত্যজনিত সম্পর্কের ভিত অনেকটাই আলগা বা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাহায্য নিয়ে তাদের সাংসারিক কার্যকলাপ পরিচলনা করে থাকে। যদিও কিছু দম্পতিরা যখন স্বামী-স্ত্রী থেকে সন্তানের অভিভাবক হয়ে ওঠে তখন তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে নানারকম জটিলতা দেখা যায়। এর ফলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা জন্মানোর সম্ভাবনা জেগে ওঠে। সেই সঙ্গে এইসময়ে তাদের মনের অনুভূতিগত সমস্যাগুলোও প্রকট হয়ে দাঁড়ায়।

কীভাবে একজন মানুষ এই শূন্য ঘরের সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে?

প্রথমে এই সমস্যাকে ঘিরে যে ধরনের অনুভূতি একজন মানুষের মনে জেগে ওঠে তা চিহ্নিত করতে হবে এবং সেই অনুভূতিগুলোর গভীরতা মূল্যায়ন করা জরুরি। এজন্য যেসব বন্ধুরা এই একই ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়েছে বা পড়েনি তাদের সঙ্গে সেই বিষয়টা নিয়ে কথাবার্তা বলতে হবে। এমন কাজকর্ম করতে হবে যাতে মানসিক সুস্থতা বজায় থাকে। এর ফলে অনন্য ব্যক্তিত্বের মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনও সম্ভবপর হয়। দাম্পত্য সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা রক্ষার জন্য নানারকম পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। যেমন- স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বাইরে বেড়াতে যেতে পারে, নতুন কোনও আনন্দদায়ক কাজ করা দরকার যা তাদের দু'জনের কাছেই উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে অথবা নিয়মিত শরীরচর্চা অনুশীলন করাও জরুরি। যদি কোনওভাবে অনবরত মনে একাকিত্ব এবং অসহায়তার বোধ জাগে এবং ওই চিন্তাই জীবনে সঙ্গী হয়ে ওঠে তাহলে একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে মানুষ কী সাহায্য আশা করতে পারে?

যদিও এই রোগ সবসময়ে ঠিকঠাকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞরা এই সমস্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে একটা নিরাপদ সমাধানের সুযোগ করে দিতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বললে মানুষের মনের অন্ধকার দূর হতে পারে, তার চিন্তাভাবনার বদল ঘটতে পারে। সেই সঙ্গে মানুষ এমন কৌশল রপ্ত করতে পারে যার সাহায্যে সে তার ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক বা অবনতি হওয়া সম্পর্ককে পুনরায় শক্তিশালী বা জোড়া দিতে সক্ষম হয়।

এই প্রবন্ধটি লেখার সময়ে নিমহানসের ডঃ প্রীতি সিন্‌হা প্রভূত সহায়তা করেছেন।   

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org