ক্যানসার কি আমার মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে?
শরীর এবং মস্তিষ্ক

ক্যানসার কি আমার মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে?

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

ক্যানসার নামক অসুখটি কেবলমাত্র একজন রুগির নয়, তার পরিচর্যাকারী এবং তার পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং আবেগানুভূতির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এই অনুভূতিগুলোর মধ্যে থাকে দৈহিক ভাবমূর্তির সমস্যা,  পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা ও কার্যকলাপের রদবদল এবং মৃত্যু ভয় প্রভৃতি। বাহ্যিক লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকে শারীরিক ক্ষমতা বা শক্তির ঘাটতি, ক্লান্তি, বমি-বমি ভাব এবং ব্যথা-বেদনা। এগুলো আবার মানুষের অনুভূতিগত বিপর্যয়ের কারণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মানসিক উদ্বেগ ও অবসাদের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য যে গবেষণা হয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে যে ক্যানসার আক্রান্ত রুগিদের ১১ থেকে ৩৭ শতাংশের মানুষের মধ্যে অবসাদ জন্মায়; এবং ২.৬ থেকে ১৯.৪ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে উদ্বেগের সমস্যা দেখা দেয়।

ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে সাম্প্রতিক গবেষণা হয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে,  বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সুস্থতার হার কিছুটা বেড়েছে। এখন ফুসফুসের ক্যানসার (লাং ক্যানসার) বা মেলানোমা-য় আক্রান্ত মানুষ যথাযথ চিকিৎসার সাহায্যে অনেক বছর বেঁচে থাকে। অর্থাৎ ক্যানসার সবসময়ে মারণ রোগ- একথা মনে করা ঠিক নয়। সেই সঙ্গে এই অসুখ মানুষের  শরীরে লাগাতার বা একটানাভাবে বাসা বাঁধে। সাধারণত ক্যানসার নির্ধারণের পর মানুষের মধ্যে এই রোগ লাগাতারভাবে দেখা দেওয়ার ফলে তার মানসিক বিপর্যয়ও শুরু হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে যেখানে দৈহিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয় সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার দিকে তেমন নজর দেওয়া হয় না। এর ফলে মানুষের সর্বাঙ্গীন সক্ষমতার উপর এই রোগের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকী, সঠিক চিকিৎসার পরিকল্পনার অভাবের জন্য মানুষের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় ও জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে ক্যানসার নির্ধারণের পর একজন রুগির মধ্যে সেই রোগ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে চার থেকে ছ'সপ্তাহ সময় লাগে। আর এই সময়েই একজন মনোবিদ বা সাইকো-অঙ্কোলজিস্টের প্রয়োজনীয়তা জরুরি হয়ে ওঠে। এই অসুখ  একজন রুগির পরিচর্যাকারী ও তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর পিছনে থাকে প্রিয়জনকে হারানোর ভয়, প্রিয়জনের কষ্ট দেখে নিজের মধ্যে বেড়ে চলা হতাশা বা প্রিয়জনের রোগমুক্তির বিষয়ে আশানুরূপ চেষ্টা করতে না পারার জন্য একপ্রকার অপরাধ বোধে ভোগা। 

কখন সাহায্যের প্রয়োজন হয়?

রোগ নির্ণয়ের ঠিক পরে-পরেই মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সহায়তা জরুরি হলেও রুগির সেই মুহূর্তে ঠিক কোন ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন তা বুঝতে হবে এবং সেক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি তখন অগ্রাধিকার না-ও পেতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে মানসিক বিপর্যয়ের কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়। যদি নীচের সেই লক্ষণগুলো একজন পরিচর্যাকারী বা ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের মধ্যে প্রকাশ পায় তাহলে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি-

  • আত্মহত্যার চিন্তা বা পরিকল্পনা করা
  • খাওয়াদাওয়া বা ঘুমের ক্ষেত্রে অক্ষমতা দেখা দেওয়া
  • পছন্দ বা ভালো লাগার কাজগুলোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
  • চিকিৎসা করাতে অনীহা দেখা দেওয়া
  • চরম হতাশা ও অপরাধ বোধে ভোগা
  • এমন কোনও বিষয় যা আগে উপভোগ্য হলেও পরে আর সেই বিষয়ে আনন্দ খুঁজে না পাওয়া
  • দৈনন্দিন কাজে বিঘ্ন ঘটা
  • মানসিক ধন্ধ ও ভুলে যাওয়ার সমস্যা
  • স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘাম হওয়া
  • চরম অস্থিরতা দেখা দেওয়া
  • নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু লক্ষণ যা নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তার অবকাশ থাকে

ক্যানসার-আক্রান্ত বহু মানুষই তাদের অসুখটাকে খুব সাহসিকতার সঙ্গে গ্রহণ করে। ফলে তাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনেক স্বস্তিদায়ক হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে এই কৌশল রুগির মধ্যে অতিরিক্ত চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে যদি না তাদের পরিচর্যাকারী বা পরিবারের সদস্যরা রুগির কথা শুনতে ইচ্ছুক না হয়। এক্ষেত্রে পরিচর্যাকারীরা যতই দুঃখ বা ভয় পাক অথবা হতাশাগ্রস্ত বা রেগে থাকুক না কেন, পরিস্থিতি যে তারা সহজভাবে মেনে নিয়েছে সে বিষয়ে রুগিকে আশ্বস্ত করতে হবে। আর এভাবেই তারা একা কষ্ট ভোগ করবে না এবং নিজেদের অনুভূতিও প্রকাশ করতে সক্ষম হবে। রুগি হিসেবে একজনের নিজেকে কখনোই অবহেলা বা অগ্রাহ্য করা উচিত নয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পারিপার্শ্বিক সাহায্যও গ্রহণ করা জরুরি।

ক্যানসার নির্ধারণের পর কী করা উচিত এবং সেই সংক্রান্ত উদ্বেগ ও অবসাদের বিষয়ে জানতে আরও পড়ুন এইধরনের প্রবন্ধ।    

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org