সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য

আমাদের সমাজে অল্পবয়সি মেয়েদের হুমকি মনে করা হয়ঃ একটি সাক্ষাৎকার

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

গত কয়েক বছরে গণমাধ্যমগুলোতে মহিলাদের উপরে হওয়া যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের অনেক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ববিদ ও লেখক ডাক্তার সুধীর ককর-এর সঙ্গে কথা বলেছিলেন হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের শ্রীরঞ্জিতা জেউরকর। ডাক্তার ককর-এর মতে মহিলাদের উপর হওয়া এই হিংসার কারণ হল নারীর স্বাধীনতার প্রসার আর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়া।

আপনি কি বিশ্বাস করেন যে ভারতে মহিলাদের উপর হওয়া হিংসা বা নির্যাতনের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে চলেছে?

গণমাধ্যমে (মিডিয়া) পাওয়া খবর থেকে মনে হচ্ছে যে এই ঘটনা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে। তবে কত পরিমাণ বেড়েছে সেকথা সত্যিই আমার জানা নেই। হতে পারে এই সমস্যা বেড়েছে। তবে মিডিয়ায় যতটা দেখানো হচ্ছে ততটা না।

তার মানে কি আমরা আজকাল এই বিষয়ে বেশি জানতে পারছি?

অবশ্যই। এটা খুবই ভালো কথা যে গণমাধ্যমের দ্বারা আমরা মহিলাদের উপর হওয়া নির্যাতনের কথা বেশি করে জানতে পারি। কিন্তু তাতে এটাও মনে হচ্ছে যে এত নির্যাতন হচ্ছে। নির্যাতন বেড়েছে, কিন্তু যতটা সংবাদমাধ্যমে দেখানো হচ্ছে ততটা সর্বব্যাপী নয়।

আপনি কি মনে করেন বেড়ে চলা এই হিংসা সমাজের নানা ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তনের প্রতিফলন?

অবশ্যই। যে পরিবর্তনটি সবথেকে বড় সেটি ইতিবাচক পরিবর্তন। হিংসা নয়, কিন্তু যে বড় বদলটা চোখে পড়ে সেটা হল আমাদের সমাজে নারী স্বাধীনতার বিষয়টা। প্রথমত, মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, কাজের ক্ষমতা স্বীকৃতি পেয়েছে। কাজ বলতে শুধু 'মেয়েলি কাজ' যেমন- শিক্ষকতা বা নার্সিং অর্থাৎ সেবামূলক কাজ নয়, কাজের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতেও মহিলারা এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে মহিলাদের উপর যে হিংসার ঘটনা ঘটছে তার মূলে রয়েছে নারী স্বাধীনতার বিষয়টা। কারণ মহিলাদের স্বাধীনতা পুরুষদের মনে ভয়ের সঞ্চার করেছে। তাই স্বাধীনতা হরণের জন্য তাদের উপর জোরজবস্তি চলছে।

দ্বিতীয়ত, এই হিংসার পিছনে রয়েছে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টাও। গ্রামীণ সমাজ ত্যাগ করে আমরা আধা-শহুরে বা নাগরিক সমাজে বসবাস করতে শুরু করেছি। গ্রামীণ সমাজে পরিবার বা বর্ণের ভিত্তিতে যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল তা মহিলাদের উপর পুরুষদের অত্যাচার রুখতে সাহায্য করত। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাই এখন হারিয়ে গিয়েছে। শহরের জীবনযাত্রায় অল্পবয়সি ছেলেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেছে এবং সেখানে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ একেবারে নেই বললেই চলে। আগে যেখানে সমাজবদ্ধতাই ছিল মূল বিষয় এখন তার বদলে ব্যক্তি-স্বাধীনতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে। ফলে মহিলাদের উপর যৌন নির্যাতনের মাত্রাও বেড়ে চলেছে।

যদি কেউ মহিলাদের উপর হওয়া যৌন হিংসার নিরিখে বিষয়টা বিবেচনা করতে চায় তাহলে তার পিছনে রয়েছে সমাজে মেয়েদের বিয়ের বয়স আগের থেকে অনেক বেড়ে যাওয়া; এই বিষয়টা অবশ্যই ইতিবাচক। যেহেতু আমাদের সমাজে এখনও নারী-পুরুষের যৌন মেলামেশার ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা নেই সেহেতু কমবয়সি ছেলে-মেয়েদের যৌন মিলনের জন্য তেমন সুযোগ-সুবিধাও নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি মানুষের মনের ক্ষোভ। এসব কিছু মিলেমিশেই সমাজে অহরহ হিংসার ঘটনা ঘটছে।

তাহলে কি এই দ্বন্দ্বটা ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার......

হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে ঠিকই।

একজন সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ববিদ হিসেবে আপনি আমাদের সমাজ নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছেন। সামাজিক প্রবণতার ক্ষেত্রে যে যে পরিবর্তন আপনার চোখে ধরা পড়েছে তার পিছনে কী কারণ রয়েছে?

এই প্রবণতার পিছনে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটা বড় বিষয়। টাকা-পয়সার মূল্য বা ধারণার পরিবর্তনের ফলে মানুষের মধ্যে আগের থেকে বেশি রোজগার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে; এক্ষেত্রে শুধু পুরুষরাই যে রোজগার করছে তা নয়। মহিলাদের মধ্যেও কাজ করে অর্থ উপার্জনের ইচ্ছে জাগছে। এজন্য মহিলাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের প্রয়োজনীতাও বাড়ছে। এটা একধরনের প্রবণতা; আমাদের সাংস্কৃতিক, কৃষ্টিজনিত মূল্যবোধের পরিবর্তনের ফলে অর্থ বা পার্থিব বস্তুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা আগের থেকে অনেক বেড়ে গিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বিগত ১০০ বছর ধরে আমাদের সমাজে পশ্চিমি সভ্যতার প্রভাব পড়েছে। তার ফলে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যেখানে নারী এবং পুরুষের ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মূল্যবোধের ক্রমাগত পরিবর্তন ও সংঘাতের ফলে আমাদের মনে নানারকম প্রশ্ন জেগেছে। ওদিকে সমাজে নারী-স্বাধীনতা একেবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব কারণ একত্র হয়ে একটি বলিষ্ঠ শক্তির সৃষ্টি হয়েছে। এরকম আরও অনেক শক্তি একত্রিত হয়ে বদলের সূচনা করেছে।

গত কয়েক বছরে মহিলাদের উপর হওয়া নির্যাতনের সমস্যা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? এই ঘটনা থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি?

অবশ্যই এই ধরণের ঘটনা থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছুই রয়েছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবতে পারেন যে, যে ধরনের মহিলাদের নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছে তাদের মধ্যে তো 'আমি' বা 'আমরা' পড়ি না। আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই মা, বউ বা মেয়ে রয়েছে। মায়েদের সঙ্গে কিন্তু হিংসার ঘটনা ঘটছে না। নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে কমবয়সি মেয়েদের সাথে। তাই এটাই আমাদের বুঝতে হবে যে কেন অল্পবয়সি মেয়েদের উপর এই হিংসার প্রকোপ বাড়ছে? এমনকী কন্যাসন্তানের উপর যে নির্যাতন হচ্ছে তা আসলে অবহেলা, এবং এর পিছনে রয়েছে নানারকম অর্থনৈতিক কারণ। কন্যাসন্তানকে বোঝা বলে মনে করা হয়, কারণ তার বিয়ের সময়ে অভিভাবককে মোটা টাকার পণ দিতে হয়। তবে আশা করা যায় যে এই মনোভাব পালটাবে এইধরনের সামাজিক চাপ কম হলে।

কিন্তু প্রশ্ন হল অল্পবয়সি মেয়েদেরকে কেন হিংসার বলি হতে হচ্ছে? এই হিংসা ঠিক কোন ধরনের মানসিকতার ফসল? কেন একজন কমবয়সি মেয়েকে সামাজে হুমকি মনে করা হয়? এসব প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের অনেক গভীরে প্রবেশ করতে হবে এবং মানুষকে যথাযথ শিক্ষিত করে তুলতে হবে। এই প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন আসলে এই মেয়েদের পরিবারেরা, যারা ভয় পান যে মেয়েটির জন্য পরিবার ভেঙে যাবে, যে এর মধ্যে যৌন হুমকি রয়েছে, কিন্তু সেই কথায় আমরা এখনই যাব না। ভারতীয় নারী কথাটি ওপর আমার আপত্তি আছে। ভারতীয় নারী বলে কিছু নেই, মহিলাদের বিভিন্ন ভূমিকা আছে, আর সেই ভূমিকাগুলো কে ঘিরে আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে।

আপনি বলছেন আমাদের সমাজে মহিলারা নানারকম ভূমিকা পালন করে। এই বিষয়ে একটু বিশদে বলবেন আমাদের?

যেমন আমি আগে বললাম, আমাদের সমাজে মায়েদের খুব সম্মান করা হয়। তাই তাদের প্রতি হিংসাকে খুবই নিন্দনীয় মনে করা হয়। কন্যাসন্তানের উপরে হিংসাকে  আধাআধি বা তারও কম। আমাদের সমাজে কতরকম আচার-আনুষ্ঠান রয়েছে, যেমন- কুমারী পুজো প্রভৃতি। হিংসা সবথেকে বেশি হয় অল্পবয়সি মহিলাদের উপর কারণ এরা সমাজের কাছে ভয়ের বিষয়। সে বিয়ের পর এক পরিবার থেকে অন্য আরেকটা পরিবারে যায়; সে তার স্বামীকে পরিবারের থেকে আলাদা করে দিতে পারে। তার স্বামী তখন বাবা-মায়ের ছেলে পরে, আগে ওই মহিলার স্বামী। যে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে তা হল আগে মধ্যমণি ছিল পরিবার বাবা-মা এবং পুত্রসন্তান যারা বিয়ে করে বাড়িতে বউ নিয়ে আসত। স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সম্পর্কের তখন ততটা গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু এখন দাম্পত্য সম্পর্ক ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর এখানেই বড়সড় দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে, যার কারণ এই অল্পবয়সি মহিলারা মনে করা হচ্ছে। যেহেতু পরিবারের ধারণা সে এই কমবয়সী মহিলাদের জন্যই পারিবারিক সত্তা ভেঙে যাচ্ছে, তাই তাদের উপরেই আক্রমণের খাঁড়া নেমে আসছে। তার প্রচেষ্টায় দাম্পত্য-টাই তার এবং তার স্বামীর জীবনে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এমন সে আগেও করার চেষ্টা করেছে টাই শাশুড়ি – বউ-এর দ্বন্দ্ব এতদিন ধরে চলছে। কিন্তু এখন এটা অনেক বেশি স্বাভাবিক, আর পারিবারিক জীবনে মধ্যমণির বদল ঘটেছে, যেখানে শাশুড়ির বদলে অল্পবয়সি মহিলা বা বউরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যার ফলে তাদের প্রভাব এবং তাদের উপর হওয়া হিংসা- এই দুটোই বেড়ে চলেছে।

আমরা প্রত্যেকে কীভাবে সমাজের বদল ঘটাতে পারি?

এক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন দরকার। আমাদের নিজেদের কাজকর্ম একান্ত নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থেকে যায়। যদি কারোর মনে নির্দিষ্ট কিছু বিশ্বাস থেকে থাকে তাহলে তা খোলাখুলি প্রকাশ করা ভালো। এমন কাজ করতে হবে যাতে সমাজে নিজেকে আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। লক্ষ মানুষের কাছে নিজেকে আদর্শ করে তলার দরকার নেই, নিজের ছোট পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের মধ্যে নিজেকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করাই বাঞ্ছনীয়।

ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখা উচিত? আপনি কি ভবিষ্যতের জন্য আশার ক্ষীণ আলো দেখতে পাচ্ছেন?

আমি শুধুমাত্র রুপোর মতো চকচকে কিছু দেখতে পাচ্ছি। অন্ধকার আছে কিন্তু যা পরিবর্তন ঘটছে তার মধ্যে রুপোই ঝলমল করছে।   

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org