সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য

বিখ্যাত ব্যক্তিদের উচিত নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার কথা বেশি করে আলোচনা করাঃ একটি সাক্ষাৎকার

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে অধিকাংশ সময় গন্য করা হয়না কারণ সমস্যাগুলো দেখা যায়না এবং তা মানুষের মনের গভীরেই থেকে যায়। এই বিষয়ে হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মনোজ চন্দ্রন কথা বলেছিলেন ভারতের অন্যতম মনস্তত্ত্ববিদ, চিন্তাবিদ এবং লেখক ডাক্তার সুধীর ককর-এর সঙ্গে। বিশিষ্ট এই মনোবিশ্লেষকের মতে শুধুমাত্র অসুস্থ ব্যক্তিরই নয়, তাদের অন্যান্য সব কাছের মানুষদেরও উচিত মনোরোগকে একপ্রকার অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করা এবং তার প্রতিকারের জন্য তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নেওয়া। সেই কথপোকথনের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হল-

'মানসিক স্বাস্থ্য'-কথাটি একজন সাধারণ মানুষের মনে ঠিক কী ধরনের চিন্তাভাবনার জন্ম দেয় বলে আপনি মনে করেন?

এই প্রসঙ্গে প্রথমেই আমি বলব সাধারণ মানুষের মনের ভয়ের কথা। কিন্তু যদি তারা একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারে তাহলে তাদের মনে ভয়ের পাশাপাশি আশাও জাগবে। তাহলে একজন ডাক্তার বা আপনাদের মতো মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পোর্টালের দায়িত্ব হল এই ধারণাকে সর্বসমক্ষে প্রতিষ্ঠা করা যে আশা মানসিক ভীতির থেকে বেশি কার্যকরী। আমার মতে এটাই হচ্ছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মস্তিষ্কের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক দিকটির যোগসূত্র গড়ে তুলতে আমাদের সমস্যা হয় কেন?

এর কারণ হল 'মস্তিষ্ক' খুব আধুনিক একটা বিষয়। মানুষ এতদিন মন নিয়ে আলোচনা করেছে, যার সঙ্গে মস্তিষ্কের কোনও যোগাযোগ ছিল না। আসলে মস্তিষ্কের সঙ্গে মনের যোগাযোগের ধারণা খুবই নতুন বিষয়। তাই মনের উপরে এই ধূসর পিণ্ড- মস্তিষ্কের যে এত বড় প্রভাব থাকতে পারে সেই বিষয়ে মানুষ এখনও অনেকটাই অজ্ঞ। তাই মস্তিষ্কের বদলে মনের প্রসঙ্গেই কথা বলা ভাল কারণ প্রকৃতপক্ষে মস্তিষ্ক আমাদের মনেরই একটা অংশ। তাই মন শব্দটাই আমাদের কাছে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের। সাধারণ মানুষের জন্য 'মস্তিষ্ক' বিষয়টা খুবই নতুন এবং অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত বিষয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাকে সবসময়েই গুরুতর সমস্যা বলে মনে করা হয়। কিন্তু সাধারণ কিছু মানসিক সমস্যা যেমন- মানসিক চাপ, অবসাদ প্রভৃতিকে আমরা জীবনের অঙ্গ বলে মনে করি। এই সমস্যাগুলোকে ঠিকভাবে চিহ্নিত করা ও তার প্রতিকারের জন্য সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যে জরুরি সেই বিষয়ে মানুষকে কীভাবে সচেতন করা যেতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন, কারণ মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা চোখে দেখা যায় না। এদের অবস্থান আমাদের মনের গভীরে থাকে। যখন সেই সমস্যা অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে তখনই তা প্রকাশ্যে ধরা পড়ে আর জটিল আকার নেয়। তাই সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্যের অব্যবস্থাগুলোকে সমস্যা বলে মনে হয় না। কারণ সেগুলো অদৃশ্য থাকে। আমাদের সমাজ এই সমস্যাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে না যে সেগুলো সত্যিকারের একটা অব্যবস্থা। কিন্তু আমি বা আমরা যাকে সমস্যা বলে মনে করলাম সেটাকে আমার সমাজ গোষ্ঠীরও সমস্যা বলে মেনে নিতে হবে। এটা পরিচয়ের মত – শুধু আমি নিজের পরিচয় একভাবে ব্যাখ্যা করলেই তো হল না, অন্যদেরও সম্মত হতে হবে যে আমি সত্যিই তাই। মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা যেমন- স্কিৎজোফ্রেনিয়া বা গভীর মানসিক অবসাদের যখন তার খোলস ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে তখন এগুলোই সত্যিকারের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাই যতক্ষণ না আমাদের সমাজ বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আপনার সমস্যাকে অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করছে ততক্ষণ এটাকে সমস্যা রূপে গণ্য করা হবে না।

তাহলে আপনি বলতে চাইছেন যে একজন মানুষের সুস্থভাবে জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং কাছের মানুষের অবদান অপরিসীম?

আমার মনে হয় এটা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে সামাজিক সহযোগিতা অত্যন্ত কার্যকরী। ব্যক্তিকে এটা বলা যে 'হ্যাঁ, তুমি পারবে এর সাথে মোকাবিলা করতে'। এসব ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ প্রচেষ্টা যথেষ্ঠ নয়।

আপনি বেশ কয়েক দশক ধরে মনোবিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন। শেষ কয়েক বছরে আমাদের দেশের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কী কী বড়সড় রদবদল আপনার চোখে ধরা পড়েছে?

মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নজরদারির ক্ষেত্রটা এখনও অর্ধেক ভর্তি ও অর্ধেক খালি অবস্থায় রয়েছে। অর্ধেক খালি কারণ ভারতের মতো দেশের আয়তন আর সমস্যার পরিমাণের তুলনায় এখনও বিশেষ কিছু হয়নি। আর অর্ধেক ভর্তি কারণ মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে মানুষের মধ্যে আগের থেকে অনেক বেশি জ্ঞান বেড়েছে। বিশেষত বড় শহরগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক বা মানসিক অসুস্থতার বিষয়ে মানুষের মনে যথেষ্ঠ জ্ঞানের সঞ্চার হয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিটাকে আমি ৫০-৫০ বলব। তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেই এখনও সীমাবদ্ধ রয়েছে। দেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এমনকী সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও এই বিষয়ে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে বলেই আমার মনে হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টা আমরা এখনও খোলা মনে স্বীকার বা গ্রহণ করতে পারি না; আমরা মনে করি এটা তেমন কোনও বড় সমস্যা নয়, আমরা ভাবি যে এই বিষয়ে আমরা সব কিছুই জানি এবং যেহেতু আমি বা অন্য কেউ যখন মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় আক্রান্ত হইনি তাই এই বিষয়টা নিয়ে আদৌ চিন্তা করার কিছু নেই। কীভাবে আমাদের প্রত্যেকের ভাবনায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে অগ্রাধিকার পাবে?

আমি আগে যে প্রশ্নটার উত্তর দিয়েছি তার সঙ্গে এই প্রশ্নের উত্তরের মিল রয়েছে। মানসিক কষ্টকে জীবনের অংশ হিসেবেই ধরা হয়। মানুষ বিশ্বাস করে যে প্রত্যেককেই জীবনে নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তাই সেটা আদৌ কোনও বড় ঘটনা নয়। আমি আগেই বলেছি যতক্ষণ না সমস্যা প্রকাশ্যে এসে জটিল আকার নিচ্ছে ততক্ষণ সমস্যাকে সমস্যা বলে মনেই করা হয় না। এখন মানুষকে এটাই বোঝানো দরকার যে এই সমস্যার ফলে মানুষের কর্মদক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ এবং তার সফলতা- সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যারা মানসিক অসুস্থতা কাটিয়ে জীবনে অর্জন করেছে, সেই সব মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, নিজের কথা বলতে হবে এবং অন্যদের আদর্শ হয়ে উঠতে হবে।

সিনেমার অভিনেতারা নিজেদের সুঠাম পেশিবহুল শরীর দেখিয়ে আমাদের কাছে শারীরিক সুস্থতার আদর্শ হয়ে ওঠে, কিন্তু আমাদের সামনে মানসিক শক্তির অধিকারী এমন মানুষের উপমা নেই বললেই চলে। অবশ্য মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কিছু উদাহরণ আমাদের কাছে আছে, যেমন - অভিনেতা দিলীপ কুমার, যাঁর দশ থেকে কুড়ি বছর ধরে সাইকোথেরাপি হয়েছিল। তাই এরকম মানুষের উদাহরণ আরও বেশি করে প্রকাশ্যে আসা দরকার। এই ধরনের রোল মডেলদেরও অনুপ্রাণিত করতে হয়। আমার পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি এমন অনেক পেশা, ব্যবসা, সামাজিক বা বিনোদন জগতের মানুষের কথা জানি যারা তাদের জীবনের নানারকম সমস্যা হয়েছে এবং এই সমস্যাগুলোকে অতিক্রম করার জন্য তাদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু এটা স্বীকার করার জন্য যে ‘আমার মানসিক সমস্যা রয়েছে’ পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে হবে। এমন আরও অনেক পথপ্রদর্শক, আদর্শ মানুষের প্রকাশ্যে আসতে হবে।

মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় মনোবিশ্লেষণের ভূমিকা ঠিক কীরকম হওয়া বাঞ্ছনীয়?

মনোবিশ্লেষণের ভূমিকা হল মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে অসচেতন মানুষকে সচেতন করা। আমাদের অচেতন মনে অনেক সমস্যার জন্ম হয় যেগুলোর বিষয়ে আমরা আদৌ ওয়াকিবহাল থাকি না, কিন্তু থাকাটা জরুরি। অনেক সমস্যা শুরু হয় ছোটবেলায়, শৈশবে পরিবার ও অভিভাবকদের সঙ্গে সম্পর্কজনিত সমস্যা বা অন্যান্য সম্পর্কজনিত সমস্যা, যা আমাদের বোঝা দরকার। এক্ষেত্রে জরুরি আত্মবিশ্লেষণমূলক মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা, মানে নিজেকে আর নিজের জীবনকে চিনতে পারা। আর এই পন্থা আমাদের ঐতিহ্যের বিপরীত শিক্ষা নয়। আত্মবিশ্লেষণের কথা তো সেখানেও বলা হয়। তবে এই আত্মবিশ্লেষণ এক্তু অন্য ধরণের। এর মধ্যে দিয়ে একজন মানুষ মানসিক সমস্যার হাত থেকে নিজেকে সুস্থ করে তুলতে পারে।        

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org