প্রান্তিক বা গৌণ মানুষের মানসিক চাপ
সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য

প্রান্তিক বা গৌণ মানুষের মানসিক চাপ

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

একজন প্রান্তিক মানুষ বা গোষ্ঠী প্রায়শই ভাবে বা তাদের ভাবতে বাধ্য করা হয় যে তারা সমাজের বিত্তবান, ক্ষমতাশালী, সুবিধাভোগী এবং সুযোগ-সুবিধা আদায়কারী মানুষের চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ, স্বল্প সুবিধাভোগী এবং কম সম্মাননীয় শ্রেণী।  চিন্তাভাবনা ও আচার-আচরণের দিক থেকে তাদের সমাজের মূলস্রোতের বাইরে বলে মনে করা হয়। প্রান্তিকতার মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা, শারীরিক সক্ষমতা, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, যৌন অভিমুখ, যৌনতা, লিঙ্গ-পরিচয়, দৈহিক ওজন, বয়স প্রভৃতি অর্ন্তভুক্ত থাকে। একজন প্রান্তিক মানুষ সমাজে কম গুরুত্ব পাওয়ার ফলে তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর তা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। যদিও আমি এই সমস্যা নিয়ে কলম ধরেছি তবু প্রান্তিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে আমি যথেষ্ঠ সচেতন। কারণ এই সমাজে আমি অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করি এবং চাই যেন সেগুলো বজায় থাকে।

যে মানুষটি সমাজে অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর বলে বিবেচিত হয় তার মধ্যে মানসিক চাপ জন্মানোর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। সমাজে যারা গৌণ ব্যক্তি তাদের মধ্যে মানসিক আতঙ্কের প্রকাশ খুব বেশি থাকে এবং মানসিক চাপের মোকাবিলা করা তাদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তাদের মনে শোষণ ও সমাজচ্যুত হওয়ার ভয় থাকে। অনুভূতিগত ও মানসিক দিক থেকে একজন প্রান্তিক ব্যক্তি নিজেকে সামাজিক পরিসর তথা বৃহত্তর গোষ্ঠী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বলে ভাবে এবং তার মনে মানসিক ভ্রান্তিজনিত সন্দেহ জাগে। আর এভাবেই অন্যদের দ্বারা তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হয়। এরা নিজেদের অদৃশ্য বা কোণঠাসা বলে বোধ  করে। তাই তাদের নিয়ে সমাজের তেমন মাথা ব্যথাও থাকে না, তাদের কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে বিচারও করে না। ফলে তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যা হিসেবে আত্মসংশয় ও হতাশা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠে। সমাজে এমন কয়েকটি প্রান্তিক গোষ্ঠী রয়েছে যাদের মধ্যে আত্মহত্যা ও আত্মহননের ঝুঁকি প্রকট হয়ে দাঁড়ায়।

সমাজে কোণঠাসা বা গৌণ হওয়ার প্রক্রিয়া খুব অল্পবয়স থেকেই শুরু হয়। অনেকসময়ে আমি খুব ভয় পেয়ে যাই যখন দেখি আমার অফিসের ৯ বছর বয়সের ছেলেটি তার দৈহিক ওজনের কারণে অন্যদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তার কাছের মানুষজন তাকে নানারকম নাম ধরে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে। কারণ তার দৈহিক আয়তন বা চেহারার বহর তাদের থেকে অনেক বেশি। তার বয়স অল্প বলে সে  বুঝতে পারে না যে কেন তার বন্ধুরা তাকে হেয় করছে। কিন্তু সে ততটাও ছোট নয় যে নিজের প্রত্যয় ও সমাজে যে সে খুব নগণ্য একজন মানুষ তা সে বুঝতে পারবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে একটাই আশার দিক হল যে সে আমার অফিসে বসে আছে এবং নিজের প্রয়োজনমতো সে সাহায্যও পাচ্ছে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে তো তেমন হচ্ছে না, যারা সমাজে প্রান্তিক হওয়ার কারণে লজ্জায় নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখছে। এবং দিনের পর দিন সমাজের চোখে তা ধরাও পড়ছে না ও তারা অবহেলিত হচ্ছে।

তাই এই সমস্যার সমাধানের জন্য কী করা প্রয়োজন?

যদি আপনি কল্পনা করেন তাহলে অনেক কিছুই করার আছে আর সেইসব কাজের তালিকা এই লেখার মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব নয়। প্রথমেই শুরু করা যাক সমাজের বিভিন্ন ব্যবস্থার (ব্যক্তি, পরিবার, স্কুল, অফিস, আইন ও শাসন) সহযোগিতার বিষয় দিয়ে। এদের মিলিত প্রচেষ্টার ফলে শিশুদের, ছাত্রদের, কর্মীদের এবং নাগরিকদের অধিকারের নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো এবং যারা মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ তাদের নিজেদের স্বীকৃতি জানানোর জন্য শিক্ষিত করার দায়িত্বও রয়েছে সমাজের। এই স্বীকৃতি তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও কোণঠাসা বোধ দূর করতে সাহায্য করবে। এবং এই গোষ্ঠীর মধ্যে কোনও একজন মানুষও যদি সমাজের প্রত্যাখ্যান কাটিয়ে উঠতে পারে তাহলে তা গোষ্ঠীর অন্যান্য ব্যক্তির মধ্যেও আশার সঞ্চার করবে এবং তাদের মনে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

সবচাইতে খারাপ হল যখন আমরা এসব গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেমন মনোযোগ দিই না এবং তাদের অবস্থা দেখেও আমরা তাদের জন্য কিছু করি না। এজন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে আদর্শ শ্রেণিবিভাগ গড়ে তোলার যেখানে প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যবিধি, জাতপাত, বয়স, যৌনতা প্রভৃতির নিজস্ব পরিচয় থাকবে। তাদের অস্তিত্বকে পৃথক করে দেওয়া নয় বরং বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে একটা মিশ্র পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করা জরুরি। একে অপরের সঙ্গে এই যোগসূত্রই তাদের বিকাশের বাধা কাটিয়ে উন্নত স্বাস্থ্য এবং সুযোগের পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করবে। আর এভাবেই সমাজের মধ্যে মানুষে-মানুষে বিভেদের প্রতিবন্ধকতাজনিত সমস্যার সমাধান করা সম্ভবপর হয়ে উঠবে।

প্রবন্ধটি লিখেছেন পিএইচডি ডিগ্রিধারী দিব্যা কান্নান। তিনি সম্প্রতি  ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাসভিল্লি-র ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাঙ্গালোরে স্থানান্তরিত হয়েছেন। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ে শেষ কয়েক বছর ধরে তিনি হিংসা থেকে বেঁচে ফেরা পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাহায্যার্থে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি একজন চিকিৎসক হিসেবে ব্যাঙ্গালোরে অনুশীলনরত।                     

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org