আমি চাই মানুষ অবসাদ সম্পর্কে এই কথাগুলো জানুক
সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য

আমি চাই মানুষ অবসাদ সম্পর্কে এই কথাগুলো জানুক

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

অবসাদ বিষয়টি সম্পর্কে মানুষের মনে অনেক ভুল ধারণা বা বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে। মনে করা হয় যে অবসাদের অনুভূতি মানে চূড়ান্ত মানসিক দুঃখ ও বিষণ্ণতা। কিন্তু অবসাদ শুধু কোনও অনুভূতি নয়, এটা একধরনের মনের আবেগ বা বিশেষ মানসিক অবস্থান। অবসাদকে অনেকটা ঘন কালো মেঘের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা মানুষের মনে একেবারে চেপে বসে এবং তা কিছুতেই ফিকে হতে চায় না। অবসাদের দিনগুলোতে চূড়ান্ত মানসিক বিষণ্ণতাজনিত অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয় অপদার্থতা ও অসহায়তার বোধ। যতক্ষণ না একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যায় ততক্ষণ অবসাদকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না। সময়ের নিরিখে পিছনে তাকালে মানসিক লড়াইয়ের বিষয়টা অনুভব করা যায়। তখন অবাক হতে হয় এই ভেবে যে আমার পারিপার্শ্বিক যদি সেই সময়ে আমার মানসিক অসুস্থতার বিষয়টা বুঝতে পারত তাহলে আমার পক্ষে লড়াই করাটা অনেক সহজ হত। বারবার মনে হত যে আমার চারপাশের মানুষজন কি আমাকে অবসাদ থেকে মুক্ত করার জন্য সাহায্য করতে পারত না? আমাকে কি অবসাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী মোকাবিলা করার জন্য তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারত না? আসলে অবসাদের অর্থ বোঝার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর।

১. একধরনের অদৃশ্য আবেগজনিত আঘাত- শারীরিক আঘাতের মতোই মানসিক বা আবেগঘটিত আঘাত সারতে সময়ে লাগে। কিন্তু শারীরিক আঘাতের মতো মানসিক আঘাত চোখে দেখা যায় না। অবসাদের মাত্রা যত গভীর হয় মানসিক আঘাতের পরিমাণও ততটাই বেশী হয়।

সহানুভূতিই হল প্রাথমিক চিকিৎসা- কাউন্সেলিং পর্ব চলাকালীন মানসিক অবসাদ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়। যখন একজন সত্যি সত্যি বুঝতে পারবে যে তার কেমন অনুভূতি হচ্ছে তখন তাকে সাহায্য করার হাজার দরজা খুলে যাবে। একজন মনোবিদের সাহায্যে মানুষ তার ক্ষয়িষ্ণু অনুভূতি প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। এর সাহায্যে মানুষ তার আবেগঘটিত আঘাতও কাটিয়ে উঠতে পারে।

২. অবসাদকে নিজের ইচ্ছামতো দূরে সরানো যায় না- অবসাদ এমন বস্তু নয় যা রাতে ঘুমানোর পর সকালে ভুলে যাওয়া যায়। অথবা কেউ ইচ্ছে করলেই অবসাদকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না।

সুস্থ হতে সময় লাগে­- অবসাদ এমন একটা অসুখ যাকে অবহেলা করা যায় না। উপযুক্ত সাহায্য পাওয়ার পর অবসাদের বিভিন্ন পর্যায়গুলো বোঝা যায়। অবসাদের এমন অনেক মাত্রা থাকে যা সঠিকভাবে চিহ্নিত করার মাধ্যমেই তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আর এই প্রক্রিয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ।

৩. অবসাদ মানে আলস্য নয়- খুব বেশি পরিমাণে খাওয়ার পরে মানুষের যেমন অনুভূতি হয় অবসাদের অনুভূতি কিন্তু তেমন নয়। অবসাদের ফলে একজন মানুষের জীবনের লক্ষ্য নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে প্রভূত সমস্যা দেখা দেয়। আরও ভালোভাবে বলতে গেলে বলা যায় অবসাদ মানুষের সামগ্রিক মানসিক স্থিতির ক্ষতি করে। আর এই আঘাত এতটাই মানুষের মনে দাগ কাটে যা সহজে ছাড়তে চায় না। অবসাদের ফলে মানুষ না চাইতেই নানারকম অপরাধ বোধে ভুগতে শুরু করে। সেই সঙ্গে আলস্যের ধারণা অপরাধ বোধকে আরও জাগিয়ে তোলে।

চাই ইতিবাচক সাহায্য ও উপলব্ধি- রুগির পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবদের এই সমস্যাকে স্বীকার করে নেওয়া জরুরি। সেই সঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিদের সাহায্য ইতিবাচক ফল দেয়।

৪. অপদার্থতা, হতাশা এবং অসহায়তার বোধ বারে বারে জেগে ওঠে- অবসাদের ফলে সবসময়েই বিষণ্ণ লাগে, অথচ তা থেকে বেরনো যায় না। যখন একজনের মধ্যে অবসাদের কালো মেঘ চেপে বসে তখন তার নিজের উপর, পারিপার্শ্বিক জগতের উপর বা ভবিষ্যতের উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এমন একটা পরিস্থিতির জন্ম হয় যেখানে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। সেই সঙ্গে নিজেকে একটা গন্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলে নিজের সম্পর্কে নানারকম নেতিবাচক মনোভাব, যেমন- অপদার্থতা, হতাশা বা অসহায়তার বোধ জাগে।

চাই যত্ন ও সাহায্য- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদের সঙ্গে পরামর্শ ও তাঁদের সাহায্য মানুষকে অবসাদ থেকে মুক্ত করতে পারে। তাঁদের কাছে অবসাদগ্রস্ত মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে কোনও মতামত ছাড়াই। এর ফলে মানুষের মনে আশা এবং অন্যের প্রতি বিশ্বাস জাগে।        

এই প্রবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা হয়েছে। 

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org