মানসিক স্বাস্থ্যকে বোঝা

দৈনন্দিন ট্রাফিকের প্রভাব কি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর পড়ে?

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

প্রতিদিন রাস্তাঘাটে মোটরগাড়ি চলাচল, বিশেষ করে ট্রাফিক জ্যাম এবং বহুক্ষণ যাতায়াতের প্রভাব যাত্রীদের উপর নানাভাবে পড়ে। রাস্তাঘাটের চেঁচামেচি, মোটরগাড়ির প্রচন্ড শব্দ এবং গতি একজন চালক ও নিত্যযাত্রীদের উপর ভীষণভাবে প্রভাব ফেলে। আর এর সবচেয়ে বড় ফলাফল হল মানসিক চাপ।

মানসিক চাপ একটা খুব বড় শব্দ বা পরিভাষা যার অনেকগুলো দিক রয়েছে। মানসিক দিক থেকে এর ফলে একজন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণহীনতা, কাজের ক্ষেত্রে হতাশা বা আমাদের প্রতিক্রিয়ায় নানারকম সমস্যা দেখা দেয় (যখন আমরা হতাশ হয়ে পড়ি তখন চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকি)।

চেতনাগত দিক থেকে আমাদের মধ্যে হতাশার জন্য নিয়ন্ত্রণহীনতা, অসহায়তার বোধ এবং সহ্যশক্তির অভাব দেখা দেয়। এর ফলে একজন মানুষের মনে যে মুহূর্তে যা মনে হয় তাই সে করে এবং প্রায়শই হঠকারী আচার-আচরণ করে।

শারীরিকভাবে একজন ব্যক্তির মধ্যে উচ্চরক্তচাপের সমস্যা, নিজেকে কোণঠাসা ভাবা, অটোমেটিক নার্ভাস সিস্টেম (সয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র)-এর কার্যকলাপ তীব্রতর হওয়া (এএনএস হল আমাদের মস্তিষ্কের একটি অংশ, যা আমাদের শরীরের সেই সব অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে যেগুলোর উপরে আমরা সচেতনভাবে নির্দেশ জারি করতে পারি না, যেমন- শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদ্‌স্পন্দন এবং পরিপাক) এবং শরীরের তাপমাত্রার বদল ঘটতে দেখা যায়। এই অবস্থা অনেকদিন ধরে চললে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অবনতি ঘটে, বিশেষ করে এএনএস-এর কার্যকলাপ যখন তীব্র হয় তখন এই সমস্যা দেখা দেয়।

সামাজিক ক্ষেত্রে রাস্তাঘাটে যানজটজনিত সমস্যা এড়ানোর জন্য মানুষ অফিস যাওয়া বন্ধ করে দেয় বা প্রায়দিনই ছুটি নিতে চায়। নিত্যযাত্রার চাপ এবং ক্লান্তির কারণে বহু মানুষ ক্রমশ চাকরি বদল করতে শুরু করে। কিছু মানুষের মধ্যে যানজট এবং মোটরগাড়ি চড়া এড়ানোর জন্য বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করার ইচ্ছেও একেবারে কমে যায়।

অন্যান্য কারণ এবং তার প্রতিফলন

ট্রাফিকের ফলে মানুষের মনে চাপ জন্মায়, কিন্তু অন্যান্য আরও কারণ থাকতে পারে যার ফলে এইধরনের মানসিক উত্তেজনা বেড়ে যায়।

  • ঘর, কর্মক্ষেত্র বা অন্যান্য জায়গায় ঘটা মানসিক সংঘাত যা রাস্তাঘাটে যাতায়াতের সময়েও মানুষের পিছু ছাড়তে চায় না

  • রাস্তাঘাটে ঘটা ঝগড়া বা বিবাদ

  • যানজটের কারণে রূঢ় আচরণ করা

এই প্রসঙ্গে মনিপাল হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সানি জোসেফ জানালেন “এই চাপ প্রায়শই আমাদের ঘরে চলে আসে। আর তার ফলে আমাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সন্তানদের বকাঝকা করে বা স্বামী-স্ত্রীর বিবাদের মাধ্যমে। এই ঘটনা চক্রাকারে ঘোরে এবং এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল হিসেবে রাস্তাঘাটে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ি চালানো প্রভৃতি ঘটনা বাড়তে দেখা যায়।”

একই ট্রাফিক, ভিন্ন প্রতিক্রিয়া

''প্রায়শই দেখা যায় যে একই পরিমাণ ট্রাফিকের প্রভাব একেকজনের ক্ষেত্রে এক-একরকম হয়। একজন মানুষের মানসিক চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং পরিস্থিতি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যেসব মানুষ সময় মেনে এবং নিখুঁতভাবে কাজ করতে চায়, এবং একসাথে অনেকগুলো কাজ করতে চায়, তাদের ক্ষেত্রে ট্রাফিকের পরিস্থিতি মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।''- এমনই মত জোসেফের।

কীভাবে যানজট এবং শব্দ মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে?

জোসেফ বলেছেন, “আমরা অধিকাংশ মানুষই সময়সাপেক্ষ ভাবে নিজেদের কাজ করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা রাস্তায় যানজটের সম্ভাবনার কথা প্রায় মনেই রাখি না। রাস্তায় বেরিয়ে আমাদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব এবং অসহায়তার বোধ জন্মায়। সেই সময় যদি কেউ অন্য কোনও বিষয় নিয়ে চিন্তারত থাকে, এবং সেই সময় যদি তাকে সমানে হর্নের আওয়াজ, ট্রাফিক, চাপ বা অতিরিক্ত উত্তেজনার সাথে মোকাবিলা করতে হয়, তখন কাজ করার অনুকূল পরিস্থিতির থেকে বেশি ক্ষমতা তাকে ব্যয় করতে হয়, এবং সেই পরিবর্তনকে তার শরীর অন্যভাবে উপলব্ধি করে।”

দীর্ঘক্ষণ ধরে যান চলাচলের ধকল এবং অনবরত গাড়ির ব্রেক ও অ্যাক্সিলেটরের প্রয়োগের ফলে মানুষ অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই মানসিক ক্লান্তির ফলাফলগুলো হল-

  • ভুল করা

  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেওয়া

  • মনোসংযোগ করার ক্ষেত্রে সমস্যা

  • যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটা

  • অল্পতেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

  • ভুলে যাওয়া

  • প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেরী হওয়া

ক্লান্তির ফলে মানুষের মধ্যে যেসব অনুভূতিগত সমস্যা হয় সেগুলো হল-

  • খিটখিটে হয়ে যাওয়া

  • ইচ্ছে বা আগ্রহ হারিয়ে যাওয়া

  • আলস্য দেখা দেওয়া

  • কর্মক্ষমতার অভাব দেখা দেওয়া

  • অতিরিক্ত শান্ত-স্থির হয়ে যাওয়া

  • সমাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা

এসব সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম এবং কাজের ফাঁকে যথাযথ বিশ্রাম। যার ফলে শরীরও খানিক স্বস্তি পায়। এর সঙ্গে জরুরি প্রচুর জল খাওয়া,  সঠিক খাওয়াদাওয়া করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং নিজের কাজ ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে সময়গত ভারসাম্য রক্ষা করে চলা। এর সাহায্যে একজন ব্যক্তি তার  মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে সক্ষম হয়।

কিছু ক্ষেত্রে ট্রাফিকজনিত চাপের ফলে রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার যে খতিয়ান দেখা গিয়েছে তাতে ট্রাফিকজনিত চাপ এবং অনুভূতিগত বা মানসিক ক্লান্তির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।

এই সমস্যায় কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

রাস্তায় যানজট এবং যাতায়াতে অনেক সময় লাগার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাস, ট্রাক, ট্যাক্সি এবং অটো রিক্সার চালকরা। এর ফলে তাদের অনবরত এক বিরাট চাপের মধ্যে থাকতে হয় এবং চরম অবস্থাতেও এরা সাহায্য পায় না। ফলে এদের চাপ ও পরিস্থিতিজনিত দুর্দশা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই চাপই শেষ পর্যন্ত গাড়ির চালকদের মনে ক্ষোভ জন্মাতে সাহায্য করে, যার কুপ্রভাব পথচারী ও অন্যান্য যাত্রীদের উপরে পড়ে।

এই প্রসঙ্গে জোসেফ বলেছেন ''উদ্বেগ ও আতঙ্কজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়া মানুষকে প্রায়শই রাস্তার যানজট নিয়ে চিন্তিত থাকতে দেখা যায়। এর কারণ হল তাদের মনে ভয় থাকে যে যদি দুর্ঘটনা বা গুরুতর সমস্যা হয় তাহলে তারা বাইরে থেকে কোনও সাহায্য বা সহায়তা পাবে না।''

কীভাবে ট্রাফিকজনিত চাপের মোকাবিলা করা যায়?

  • ট্রাফিকজনিত চাপের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে অন্যতম সেরা উপায় হল কারপুলিং। সহযাত্রীরা সঙ্গে থাকলে গাড়ি চালানোর চাপের কারণগুলির দিকে মন যায়না এবং এর ফলে মানসিক চাপ কমানোর সম্ভব। জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া মানুষকে শান্ত থাকতে সাহায্য করে এবং এর ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। বৃহত্তর ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে টাইম ম্যানেজমেন্ট-এর মতো সামাজিক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানগুলো সাহায্য করে। নীতিগত দিক থেকেঃ

-আইনকানুনগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ ও মেনে চলা উচিত। যেমন- বাণিজ্যিক কারণে ব্যবহৃত যানবাহন এবং এইচটিভিগুলোর চলাচল স্কুল ও অফিস টাইমে বন্ধ রাখা একান্ত জরুরি।

-পার্কিং-এর জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে এবং পার্কিংজনিত নিয়মকানুন বলবৎ করতে হবে।

-যাদের কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন পড়বে তাদের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিংগত পরিষেবার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এর মাধ্যমে সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এমন মানুষ, ট্রাফিক পুলিশের অফিসার, গাড়ির চালক এবং অন্যান্যদের চিহ্নিত করা সম্ভব।

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য ব্যাঙ্গালোরের মণিপাল হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সানি জোসেফের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। 

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org