মানসিক রোগ থেকে সেরে ওঠা
মানসিক স্বাস্থ্যকে বোঝা

মানসিক রোগ থেকে সেরে ওঠা

কোন মানসিক রোগীকে সুস্থতার পথে ফিরিয়ে আনতে পরিবার এবং প্রিয়জনদের খুবই বড় ভূমিকা থাকে

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

সেরে ওঠা বলতে আমরা কি বুঝি?

সেরে ওঠা মানে শারীরিক এবং মানসিক অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়া। স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করবার ক্ষমতা ফিরে পেলে, কোন রোগীকে সুস্থ বলা যেতে পারে।

সেরে ওঠার পথ রোধ করে স্টিগমা বা সমাজের চোখে কলঙ্ক। যে কারণে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সমাজে মিশতে বা নিজের মনের কথা বলতে ভয় পান। তাঁরা ভাবেন যে তাদের নিয়ে ঠাট্টা বা রসিকতা করবে বাকিরা। এই কারণে তাঁরা নিজেদের মানসিক সমস্যার কথা কাউকে জানান না। যখন তাঁদের সমস্যা বেড়ে রোজকার জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করে, তখন তাদের কাছে ডাক্তার দেখানো ছাড়া আর উপায় থাকে না।

অথচ সেরে ওঠার প্রথম অধ্যায় হলো নিজের রোগ বুঝতে পারা এবং সেরে উঠতে মনস্থির করা। এই চেষ্টা থাকলে সেরে ওঠা আরো সহজ হয়ে ওঠে।

আরোগ্য একটি হোলিস্টিক প্রণালী। থেরাপি, ওষুধ ও চিকিৎসা ছাড়া প্রয়োজন হয় পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সাহায্য।

তার সাথে এটাও মাথায় রাখা উচিৎ যে প্রত্যেক মানুষ একে অপরের থেকে আলাদা। তাই তাদের সবরকম অবস্থার সাথে মানিয়ে ওঠার উপায়ও আলাদা। একেকজন মানুষের অবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে একেকরকম সময় লাগে।

গুরুত্বপূর্ণঃ মানুষ মাত্রই ভালোবাসা এবং স্নেহের পাত্র। একজন মানসিক রোগীও বাকি পাঁচটা মানুষের মত আদর ও স্নেহ চায়, বিশেষ করে সেরে ওঠার পর্যায়। তাতে তাদের ইমোশানাল হীলিং বা মানসিক শান্তি বজায় থাকে।

“মানসিক রোগীরও জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষা বাকি পাঁচজনের থেকে আলাদা নয় - সুখের সম্পর্ক, মাথার ওপর ঠাঁই, সফল চাকরি, ভালো রোজগার এবং সমাজের সব মানুষের সাথে মিলে মিশে থাকা। কিন্তু যিনি গম্ভীর মানসিক রোগে ভুগছেন, তাঁর পক্ষে এগুলো হাসিল করা অত্যন্ত কঠিন। এত বছর গবেষণা এবং সেরে ওঠার সাম্ভাবনা জানার পরেও, আজ এটাই সত্য। এই সামাজিক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে সামাজিক অবহেলা এবং চিকিৎসার অভাব।”– আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

সেরে ওঠার পথে কী কী বাধা আসতে পারে?

যদিও আমরা জানি যে সময়মত চিকিৎসা পেলে মানসিক রোগী সেরে ওঠে, কিন্তু এই সেরে ওঠার পথে অনেক রকম বাধা দেখা দেয়। প্রথমত রোগটাই সব চেয়ে বড় বাধা কারণ আমাদের সমাজ এখনো মানসিক রোগকে ভালো চোখে দেখে না বা সঠিক বোঝে না। সমাজের কটাক্ষ যে কোন রোগীর মনে আরও চাপ সৃষ্টি করে তার অসুস্থতা বাড়িয়ে দেয়।

রোগী, তার পরিবারের সদস্য, এমনকি চিকিৎসকদের মধ্যে রোগ সম্বন্ধে সচেতনতার অভাব সেরে ওঠার পথ রোধ করতে পারে। তাঁরা রোগের উপসর্গ এবং রোগীর মানসিক পরিস্থিতি দরুন ব্যবহারের পার্থক্য বোঝেন না। এতে চিকিৎসায় দেরী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সমাজ মানসিক রোগীকে কীভাবে সাহায্য করতে পারে?

যাঁরা মানসিক রোগে আক্রান্ত তাঁরা পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা এবং সাহায্য পেলে অনেক তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে পারেন। ঠিক শারীরিক রোগের মত, মানসিক রোগও যে কোন মানুষের হতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে মানসিক রোগ নিয়ে নানারকম ভুল ধারণা আছে। সব জেনেও আমরা মানসিক রোগীকে সকলের সমান চোখে দেখি না। নানা কারণে আমরা তাদের আলাদা করে দিই। তাদের মনের কথা জানবার চেষ্টাও করি না। তাই অনেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসা করাতে যেতে ভয় পায়। অনেক সময় এই রোগের জন্য অনেকে তাদের পরিবার, সন্তান, বন্ধুবান্ধব, সবাইকে হারায়। একজন মানসিক রোগীর মান সম্মান বজায় রাখা, তার ন্যায্য অধিকার স্বীকার করা সমাজের দায়িত্ব।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে, নরম্যান সারটোরিয়াস, সাইকিয়াট্রিস্ট ও ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্তন নির্দেশক, বললেন, “আমার মনে হয় যে মানসিক রোগীদের সঠিক চিকিৎসা ও যত্নের পথ রোধ করে স্টিগমা। মানসিক রোগ তাদের এমন ভাবে চিহ্নিত করে যে সমাজ তাদের দেখে ভয় পায়, তাদের থেকে দূরে থাকে বা তাদের মানুষ বলে গণ্য করে না। এতে আমাদের কর্তব্য পালন করা কঠিন হয়ে ওঠে। আমরা এই চিন্তাধারা না পাল্টালে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যেতে পারব না।”

আমি একজন মানসিক রোগীকে কী করে সাহায্য করতে পারি?

মানসিক রোগী সব সময় ইমোশানাল সাপোর্ট বা সমর্থন খোঁজেন। তাঁর শুভাকাঙ্খী হয়ে আপনি তাঁর দিকে সেই সমর্থনের হাত বাড়ালে, সুস্থতার গতি আরো প্রবল হয়ে উঠবে। কিন্তু, আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং সর্বদা তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে।

আপনি নিম্নলিখিতভাবে আপনার আপনজনকে সাহায্য করতে পারেনঃ

  • সর্বদা তাঁর পাশে থাকবেন।

  • খুব মন দিয়ে তাঁর কথা শুনবেন যাতে তাঁরা মনের সব কথা খুলে বলতে পারে। কথা বলা, গল্প করা এক ধরণের থেরাপি।

  • তাঁর সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যান এবং ওষুধ খেতে উৎসাহিত করুন।

  • তাঁকে দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করুন এবং বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে রাখুন।

  • তাঁকে নিয়ে বেড়াতে যান, অন্যদের সঙ্গে গল্প করুন।

  • সমর্থন দিন এবং সেরে ওঠার আশা দেখান।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org