কল্যাণ

রাগ কি স্থায়ী সমস্যা হয়ে উঠতে পারে?

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন

রাগ যখন একপ্রকার সমস্যা

দৈনন্দিন জীবনে আমাদের প্রত্যেকেরই কোনও না কোনও বিষয় নিয়ে রাগ হয়। মানুষের জীবনে রাগের অনুভূতি অত্যন্ত স্বাভাবিক, সঙ্গত, অত্যাবশ্যক এবং যথাযথ একটি বিষয়। রাগ হওয়ার পিছনে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ- যে কোনও ঘটনাই থাকতে পারে। নিম্নলিখিত ঘটনাগুলি আমাদের মধ্যেকার রাগকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে:

বাহ্যিক ঘটনা

  • চাপের কারণে কোনও অযাচিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া
  • অন্য কোনও মানুষের অযৌক্তিক বা অপ্রত্যাশিত কাজকর্ম
  • আমাদের একে অপরের চাহিদাগুলোর মধ্যে মিল না থাকা

অভ্যন্তরীণ ঘটনা

  • কোনও মানুষ বা পরিস্থিতির দ্বারা আঘাত পাওয়া, অখুশী হওয়া বা হতাশায় ভোগা
  • কিছু স্মৃতি, অসমাধানযোগ্য সমস্যা অথবা পারস্পরিক বিবাদ বা দ্বন্দ্ব
  • অন্য কারোর বা জীবনের কাছ থেকে অবাস্তব প্রত্যাশা করা

রাগের ফলে আমরা অনেকসময় অভদ্র, অবিবেচক হয়ে পড়ি অথবা নিজেদের বা অপরের সম্মান নষ্ট করা কিংবা শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতি করার মনোভাব জেগে ওঠে। যদিও যে কোনও অস্বস্তিকর ঘটনা বা পরিস্থিতির ফলে আমাদের মধ্যে যে রাগের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় তা স্বাভাবিক বিষয় হলেও, এটা মাঝে মাঝে গভীর সমস্যা হয়ে উঠতে পারে-

  • যখন রাগ মাত্রাছাড়া হয়
  • রাগের বহিঃপ্রকাশ যখন যথাযথ না হয়
  • যখন রাগ মানুষের মনের ভিতরেই ফুঁসতে থাকে, বাইরে তার কোনওরকম প্রকাশ ঘটে না

যখন কেউ মাত্রাছাড়া রাগে ফেটে পড়ে তখন তার মধ্যে হৃদরোগজনিত সমস্যা এবং হাইপারটেনশন দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাগ যদি খুব গভীর এবং হামেশাই হতে থাকে তাহলে তা আমাদের শরীরে এবং মনে চাপ বাড়াতে পারে।

মৌখিক বা দৈহিকভাবে রাগের প্রকাশ যখন যথাযথ না হয় তখন আমরা মারমুখী হয়ে উঠি এবং গালিগালাজ করতে শুরু করি। এই ঘটনায় কেউ কেউ আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয় এবং এর ফলে মানুষের পারস্পরিক ব্যক্তিগত ও পেশাদারি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।

অবদমিত বা চাপা রাগের ফলেও আমাদের শরীরে এবং মনে চাপজনিত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ছোটবেলায় মানুষের মধ্যে এহেন চাপা রাগের জন্ম হয়। কারণ সেই সময়ে আমরা রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে সক্ষম থাকি না। এই চাপ রাগ আমাদের সবসময়ে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা বা খারাপ মানুষের কথা চিন্তা করতে বাধ্য করে এবং এর ফলেই আমরা একদিন হঠাৎ করে ভীষণ রাগে ফেটে পড়ি। দীর্ঘদিন ধরে রাগ মনে পুষে রাখলে তা থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাগের বহিঃপ্রকাশ যদি যথাযথ এবং সঠিক মানুষ বা পরিস্থিতির উপর দেখানো না যায় তাহলে তা পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভুলভাল মানুষ এবং পরিস্থিতির উপর এসে পড়ে। এর ফলে রাগের পিছনে থাকা প্রকৃত ঘটনা চাপা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই মানুষে-মানুষে ভুল বোঝাবুঝি ও পারস্পরিক বিবাদের জন্ম হয়।

রাগজনিত সমস্যার কারণ

রাগ তখনই সমস্যায় পরিণত হয় যখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রাগ তখনই স্বাভাবিক একটি বিষয় হয় যখন তা আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে এবং রাগের বহিঃপ্রকাশ যথাযথ হয়, যা নিজের বা অন্য কারও পক্ষে ক্ষতিকারক হয় না।

নিচের বিষয়গুলি রাগ নিয়ন্ত্রণ ও তার প্রকাশে সাহায্য করে থাকে-

  • রাগের সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা প্রয়োজন: রাগ নিয়ন্ত্রণের এটাই প্রথম ধাপ। কীভাবে আমরা রাগজনিত সমস্যাগুলি সম্পর্কে সচেতন হব-

                  ১. রাগের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে জানতে হবে

                  ২. রাগ হওয়ার পিছনে আসল কারণগুলো জানা প্রয়োজন

                  ৩. রাগ হওয়াটা কি সঙ্গত নাকি রাগের কোনও ভিত্তি নেই- এই বিষয়টা বোঝা দরকার

  • প্রতিদিন নিজেকে শিথিল বা চাপমুক্ত রাখার কৌশল অনুশীলন করতে হবে: আমরা জানি যে রাগের ফলে আমাদের শরীরে নানারকম সমস্যা দেখা যায়। যেমন- হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যায় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এর জন্য প্রতিদিন গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত শরীরচর্চা করা জরুরি। সেই সঙ্গে পেশি শিথিল রাখার কৌশলও রপ্ত করা দরকার। কারণ এটি রাগ কমাতে সাহায্য করে।
  • রাগের বহিঃপ্রকাশ যথাযথভাবে হওয়া প্রয়োজন: যে কোনও অনুভূতিরই একটি যথাযথ বহিঃপ্রকাশ হওয়া কাম্য। এটা রাগের অনুভূতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাগজনিত অনুভূতি এবং হতাশা প্রকাশের জন্য শান্ত ও সম্মিলিত থাকা প্রয়োজন। এটি রাগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অন্যান্য পন্থাগুলির মধ্যে রয়েছে বই পড়া, কবিতা লেখা বা শিল্পকাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখা।
  • পারস্পরিক চাহিদা এবং প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা: মানুষের পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকতে হবে। এর ফলে পারস্পরিক আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলি ভালোভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব।
  • বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া জরুরি: যদি দেখা যায় যে, উপরের কৌশলগুলি অবলম্বন করার পরেও রাগ নিয়ন্ত্রণে আসছে না তখন একজন বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া অবশ্যই দরকার। যথাযোগ্য কাউন্সেলর বা মনোবিদের সাহায্যে একজনের রাগ নিয়ন্ত্রণের বন্দোবস্ত করা সম্ভব।

সূত্র: Controlling anger before it controls you: http://www.apa.org/topics/anger/control.aspx

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন
bengali.whiteswanfoundation.org