We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.
মৌল্লিকা শর্মা

বিল্ডিং ব্লকস্

আপনার হতাশা কি আপনার সন্তানের মানসিক সুস্থতার উপর প্রভাব ফেলছে? - মৌল্লিকা শর্মা

একজন শিক্ষক তাঁর এক কিশোর (ষষ্ঠ শ্রেণীর) ছাত্রীকে পড়াশুনায় খারাপ ফলাফলের জন্য আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। মেয়েটির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে সেই শিক্ষকের মনে হয়েছিল যে মেয়েটি অত্যন্ত অমনোযোগী এবং কোনও কিছুতে মন বসাতে পারেনা। সেই সঙ্গে এটিও মনে হয়েছিল যে মেয়েটির হয়তো অন্য কোন সমস্যা রয়েছে যা বাইরে থেকে বোঝা যায়না।

আমি প্রথম প্রচ্ছদে অভিভাবকত্ব এবং মানসিক সুস্থতার ওপরে একটি সুদৃঢ় সম্পর্কের বিবরণ দেব বলেছিলাম। তাই আমি এখানে শিশুদের মানসিক সুস্থতার উপর অভিভাবকদের হতাশার সম্ভাব্য প্রভাবগুলির বিষয়ে নিজের মতামত ব্যাক্ত করতে চাই।


একজন শিক্ষক তাঁর এক কিশোর (ষষ্ঠ শ্রেণীর) ছাত্রীকে পড়াশুনায় খারাপ ফলাফলের জন্য আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। মেয়েটির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে সেই শিক্ষকের মনে হয়েছিল যে মেয়েটি অত্যন্ত অমনোযোগী এবং কোনও কিছুতে মন বসাতে পারেনা। সেই সঙ্গে এটিও মনে হয়েছিল যে মেয়েটির হয়তো অন্য কোন সমস্যা রয়েছে যা বাইরে থেকে বোঝা যায়না। তাই সেই মেয়েটি আমার কাছে আসে এবং আমরা খুব সহজেই একে অপরকে বুঝতে পেরেছিলাম।  


কিছু প্রশ্নোত্তরের পরেই মেয়েটি নিজের পায়ের উপরে পড়া কিছু ক্ষতচিহ্ন আমায় দেখায়। তার মা তাকে লোহার গরম রড দিয়ে মারেন। এটা জানার পর আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাউন্সেলার হওয়া সত্বেও এমন কিছু পরিস্থিতি আসে যা আপনাকে সম্পূর্ণ ভাবে স্তম্ভিত করে দেয়। আমিও একজন মা, আমারও প্রায় ওই বয়সী একটি মেয়ে আছে। আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে কি হচ্ছে।


এই সমস্যাটি আমার বেশ জটিল বলে মনে হয়েছিল। অনেক ভাবনাচিন্তা করার পর আমি সিধান্ত নিলাম যে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবে জানার জন্যে আমি মেয়েটির মা-বাবার সঙ্গে দেখা করব। জানতে চাইব যে তাঁদের মেয়ে এমন কি দোষ করেছে যে তাঁর মা তাকে এই রকম কষ্ট দিতে বাধ্য হয়েছেন?


অনেক ডাকাডাকির পরে ওঁনারা অবশেষে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আমি তাদের কাছে জানতে পারি যে তারা দুজনেই চাকরি করতেন।  তাঁদের মেয়ে পড়াশুনায় অবনতি হতে শুরু করে এবং তার মধ্যে লার্নিং ডিসেবিলিটি বা শেখার অক্ষমতা দেখা যায়। স্কুল থেকে তার মা-বাবা কে ডেকে পাঠানো হয় এবং তাঁদের বলা হয় মেয়েটির আলাদা করে যত্ন নিতে। এই জন্য স্কুল থেকে তার মায়ের উপর কিছুটা চাপও সৃষ্টি করে। শেষমেশ মেয়েটির মা হতাশ হয়ে বাধ্য হন নিজের চাকরি ছেড়ে তার মেয়ের উপর পুরোদমে মনোযোগ দিতে। . 


তাঁর হতাশার কারণগুলি ঠিক কী? তাকে শুধু তার মেয়ের জন্যই চাকরি ছাড়তে হয়নি, ছাড়তে হয়েছিল লিঙ্গ বৈষম্যের কারণেও। কেন একজন মা কে নিজের চাকরি জীবন উৎসর্গ করতে হবে? কেন একজন বাবা সেটি করতে পারেন না? তারপর রয়েছে আত্মমর্যাদার কারণ - চাকরি করে যে সম্মান পাওয়া যায়, তা অভিভাবকত্বে পাওয়া যায়না। এছাড়াও দাম্পত্য জীবনে অশান্তি। কেন তাঁর স্বামী তাকে জোর করেন চাকরি ছাড়ার জন্য? এছাড়া তাঁর শ্বশুর- শাশুড়ির প্রতিও রাগ কারণ তাঁরা এগিয়ে আসেননি মেয়ের দেখাশুনা করার জন্য।


এত সব দায়িত্ব, হয়তো এর চেয়েও বেশি, কিন্তু আমি শুধু এইটুকুই জানতে পারলাম তার কাছ থেকে। কারণ সেই প্রথম সাক্ষাৎকারের পর তিনি আর আমার সাথে দেখা করেননি। এর মাসুল কাকে দিতে হচ্ছিল? ১৩ বছর বয়সী এক নির্দোষ মেয়েকে যে নিজেই জানত না যে তার মা তাকে কেন এতো ঘৃণা করে। মেয়েটি সবসময় ভয়ে থাকতো যে কখন তার মা তাকে শাস্তি দেবে। এই কারণেই সে শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণায় ভুগত। যেহেতু পারিবারিক কেচ্ছার কথা সে বাইরে কাউকে বলতে পারত না, তাই তার যন্ত্রণার ভারটা নেওয়ার জন্যেও কেউ এগিয়ে আসত না। তার পরিবারের জন্য সে নিজেকে অভিশাপ বলে মনে করত। এর পরে বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে আর কোনও সন্দেহ ছিলনা, যে কেন মেয়েটি স্কুলে এত অমনোযোগী।


সেই প্রথম সাক্ষাৎকারের পর আমার সঙ্গে মেয়েটির আর দেখা হয়নি, কারণ তার মা-বাবা তার স্কুল পাল্টে দেয়। অনেক জোর করা সত্বেও তারা আর কেউই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। তাঁদের ধারণা ছিল স্কুলই সমস্যার কারণ, তাঁরা নন।

কিন্তু আমার মনে অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল, যেগুলি এখন করতে চাই।

পরিস্থিতি কতটা বদলাত যদি মেয়েটির মা তার নিজের সমস্যা গুলি বুঝতে পারতেন? অনেক ক্ষোভ হওয়া সত্বেও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তার হতাশার কারণগুলি যথাযথ। কিন্তু তিনি যদি তাঁর ব্যাক্তিগত সমস্যালিকে সঠিক ভাবে সমাধান করার চেষ্টা করতেন তবে হয়ত তাঁর মেয়েকে এর সাজা পেতে হত না।

নিজের ব্যাক্তিগত হতাশার প্রভাব সন্তানের উপর ফেললে তার মানসিক সুস্থতার কি পরিণতি হতে পারে? আমার কাছে এর কোন সঠিক উত্তর নেই। তাই আমি শুধুই অনুমান করতে পারি। বড় হয়ে হয়ত মেয়েটির আত্মসম্মান বোধ তৈরি হবে না যা ভবিষ্যতে তাঁর ব্যাক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলবে। সে হয়ত কারোর উপর ভরসা করতে পারবে না। সে হয়ত নিজের ক্ষমতাগুলি পরীক্ষা করে দেখতে পারবে না। বড় হয়ে হয়ত সে আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়বে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এও হতে পারে, যে তার নিজের সন্তানকেও তার হতাশার মাসুল গুণতে বাধ্য করবে কারণ ভাল অভিভাবকত্বের উদাহরণ তাঁর জানা নেই।

আমরা জানি যে একজন মা তাঁর সন্তানকে সে ভাবেই মানুষ করে, যেভাবে সে নিজে বড় হয়েছে। যত শীঘ্র আমরা এই হিসেবটা বুঝতে পারব এবং সেটা ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারব, তত শীঘ্র আমরা নিজেদের সন্তানকে ভাল রাখার উপাদানগুলি বুঝতে পারব। আসুন, নিজেদের সন্তানের মানসিক সুস্থতার কথা ভেবে নিজেরাই নিজেদের হতাশা গুলির সম্মুখিন হই। নিজেদের জন্যে নয়, সন্তানের কথা ভেবেই আমাদের এটি করতে হবে। হতাশ বা বিস্বাদ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। নানান কারণে হতাশ হয়ে পড়া খুবই সাধারণ এবং স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আমাদের সচেতন হতে হবে, যাতে আমাদের হতাশাগুলি অন্যকে গ্রাস না করে ফেলে।

এখানে আমি যে উদাহরণটি দিলাম, তা হয়ত কিছুটা হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ের হতে পারে। আপনারা এটাও ভাবতে পারেন যে যেহেতু আপনাদের নিজেদের পরিস্থিতি এরকম নয় তাই এর গুরুত্ব আপনাদের কাছে কম। হ্যাঁ, এটি সত্যিই একটি চূড়ান্ত পর্যায়ের ঘটনা। আর ঠিক সেই কারণেই ঘটনাটির কথা আমি আপনাদের জানাচ্ছি। আসলে কখনও কখনও কিছু বিষয়ের গুরুত্বটা বোঝার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের উদাহরণের প্রয়োজন হয়। হতাশা বা বিস্বাদ অনেক ভাবে দেখা দিতে পারে। একটি মহিলার কথা ভাবুন যিনি সদ্য তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন এবং তাঁর দুই কিশোর ছেলেমেয়ের সমস্ত দায়িত্ব একা নিতে হচ্ছে। অথবা আরেকজন মহিলার কথা ভেবে দেখুন যাকে নিজের পাঁচ পাঁচটি সন্তানের সমান ভাবে দেখাশুনো করতে হয়, কারণ তাঁর স্বামী কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। অথবা একজন সৎ-মা যিনি সবসময় সংসারে নিজের মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্খায় নিজের সৎ-ছেলে বা সৎ-মেয়ের পড়াশুনার ফলাফল নিয়ে চিন্তিত। ভেবে দেখুন একজন গৃহবধূর কথা যিনি ভয় পান যে তাঁর সন্তান ঘর ছেড়ে চলে যাবে, এবং তিনি নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবেন।

হতাশা অনেক রকমেরই হতে পারে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের হতাশাগুলি আমাদের নিজেকেই চিনতে ও বুঝতে শিখতে হবে। আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের এই সকল হতাশা থেকে মুক্তি দেই। 

 

মৌল্লিকা শর্মা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত একজন কাউসেলার যিনি নিজের কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে মনোরোগ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি নিয়মিত ব্যাঙ্গালুরুর রীচ ক্লিনিকে বসেন। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখানে পাক্ষিক ভাবে ছাপানো হবে।