থাইরয়েডের সমস্যা কি আমার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে?

থাইরয়েড বলতে কী বোঝায়?

থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের গলার কাছে অবস্থিত। এই গ্রন্থি থেকে অনেকগুলো হরমোন উৎপন্ন হয়, যাদের বলা হয় থাইরয়েড হরমোন। এই হরমোন আমাদের শরীরের মেটাবলিক হার ও প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে থাকে। এই হরমোন নিঃসরণের ভারসাম্যহীনতার প্রভাব মানুষের দৈহিক স্বাস্থ্য এমনকী তার মানসিক ও অনুভূতিগত স্বাস্থ্যের উপরেও পড়ে।

থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলো হল-

১. হাইপোথাইরয়েডিজম বা অপর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ। ভারতীয় পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যার মধ্যে এটা প্রায়শই দেখা দেয়।  

২. হাইপারথাইরয়েডিজম বা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণ থাইরয়েড হরমোনের নিঃসরণ।

৩. থাইরয়েড ক্যানসার।

৪. গয়টার বা গলগন্ড (থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া)।

এগুলোর মধ্যে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণের ভারসাম্যহীনতাজনিত সমস্যা (হাইপারথাইরয়েডিজম এবং হাইপোথাইপোথাইরয়েডিজম) অধিকাংশ সময়ে বিশেষত মহিলাদের মধ্যেই দেখা দেয়।

থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ফলে মানুষ মানসিক দিক থেকে খুব বিষণ্ণ থাকে। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা যেমন- অবসাদ ও উদ্বেগের মিল রয়েছে। তাই যেকোনও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নির্ধারণের সময়ে প্রথমে থাইরয়েডের সমস্যার বিষয়ে জেনে নেওয়া জরুরি।

(এই বিষয়ে আরও পড়ুন- দৈহিক স্বাস্থ্যের সমস্যা যার লক্ষণ অবসাদের মত)

কীভাবে থাইরয়েড ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে?

১. হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণের সঙ্গে মানসিক অবসাদের মিল রয়েছে- এর ফলে মানসিক বিষণ্নতা, ক্লান্তি, মনঃসংযোগ ব্যাহত হওয়া, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা, খিদে কমে যাওয়া এবং ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যা হতে দেখা যায়। অন্যদিকে, হাইপারথাইরয়েডিজমের সঙ্গে মানসিক উদ্বেগের লক্ষণগুলোর মিল রয়েছে, যেমন- উচ্চ রক্ত চাপের সমস্যা এবং হৃদস্পন্দনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।

২. থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ফলে মহিলাদের শরীরে বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটে, যেমন- ওজন বৃদ্ধি, মুখমণ্ডলে লোমের পরিমাণের আধিক্য বা চোখের প্রসারণ বা চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসা প্রভৃতি, যা আবার দৈহিক ভাবমূর্তিজনিত সমস্যার সৃষ্টি করে।

যদি কারোর লাগাতার হাইপারথাইরয়েডিজমের সমস্যা থাকে তাহলে নীচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়-

  • ডিসফোরিয়া (জীবনের সব বিষয়েই অসন্তুষ্টি)
  • উদ্বেগ
  • খিটখিটে ভাব
  • মনঃসংযোগ ব্যাহত হওয়া

যদি কারোর হাইপোথাইরয়েডিজম থাকে তাহলে তার মধ্যে নীচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়-

  • মানসিক বিষণ্ণতা
  • মস্তিষ্কের ধোঁয়াশা বা মস্তিষ্ক যথাযথভাবে কাজ না করা
  • কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে অনীহা
  • আলস্য দেখা দেওয়া

বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসার পরে যেকোনও মানসিক অসুখের চিকিৎসা হওয়া উচিত বা পর্যায়ক্রমে এই দুটি সমস্যার চিকিৎসাই করা উচিত।

তাই, এসব ক্ষেত্রে পরামর্শ হল যে কোনও মানসিক সমস্যার চিকিৎসার প্রস্তুতির আগে থাইরয়েডের বিষয়টা খতিয়ে দেখে নেওয়া জরুরি বা পাশাপাশি এই দুই সমস্যার চিকিৎসাই পর্যায়ক্রমে করা যায়।

সমস্যার মোকাবিলা- নিজের যত্ন নেওয়া

থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এমন এক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন এবং যথাযথ চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবহার। যদিও এই চিকিৎসা মানুষের মানসিক অসুস্থতা দূর করতে সাহায্য করলেও, চিকিৎসার পরেও তার মানসিক বিষণ্ণতা বজায় থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে তার করণীয় হল-

  • নিজের মেজাজ-মর্জির বদল সম্পর্কে ডাক্তারের সঙ্গে কথাবার্তা বলা
  • এবিষয়ে বিশ্বাসভাজন কারও সঙ্গে কথা বলা
  • শারীরিক কসরত বা যোগব্যায়াম করা
  • নিজের সহযোগী দলে যোগদান করা
  • একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ সন্দীপ দেশপাণ্ডে, ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অরুণা মুরলিধর এবং মনস্তত্ত্ববিদ গরিমা শ্রীবাস্তবের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।   

  

 

Was this helpful for you?